পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট সরবরাহের প্রস্তুতি; বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে টানা ৭-৮ মাসের জটিল পরীক্ষা
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন শেষ পর্যায়ে। সব ঠিক থাকলে আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিক অবস্থায় প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে বাজারে সরবরাহ করা এবং ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ধারণক্ষমতার প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ শক্তিতে সচল হতে আরও ৭ থেকে ৮ মাস সময় লাগতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া গত ১২ মে সম্পন্ন হয়েছে। চলমান কারিগরি পরীক্ষা শেষে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত বিভাজন বিক্রিয়া (ফিশন) শুরু হলে উৎপন্ন তাপে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বাংলাদেশ।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার জটিল ধাপে রূপপুর
ডিসেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও কারিগরি জটিলতার কারণে তা কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে বলে মনে করছেন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উৎপাদনের দুটি ধাপে যথাক্রমে ২,০৪৬টি ও ৯০টি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে আরও ১৮টি জটিল পরীক্ষা বাকি রয়েছে। প্রতিটি ধাপে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) নিবিড় বিশ্লেষণ ও সরাসরি অনুমোদনের পর পরবর্তী ধাপে এগোনো হচ্ছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, “পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। কোনো পরীক্ষা অসম্পূর্ণ থাকলে বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে পরবর্তী ধাপে যাওয়া যায় না। তাই নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সময় ঘোষণা করা কঠিন। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পূর্ণ সবুজ সংকেত পেলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু হবে।”
প্রকল্পের সার্বিক চিত্র ও মূল তথ্য
| বিষয় | তথ্য ও অগ্রগতি |
| মোট কেন্দ্র ক্ষমতা | ২,৪০০ মেগাওয়াট (১,২০০ মেগাওয়াট × ২ ইউনিট) |
| চলতি লক্ষ্যমাত্রা | আগামী মাসে পরীক্ষামূলক ৩০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ |
| পরীক্ষামূলক উৎপাদনের মেয়াদ | টানা ৭–৮ মাস |
| প্রকল্প খরচ | ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা (ডলারের দাম বাড়ায় ২৬,০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি) |
| জ্বালানি সরবরাহকারী | টিভিএল (রাশিয়া); বর্জ্য রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর চুক্তি ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত |
| প্রকল্পের বাড়তি সময়সীমা | ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে |
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানির উৎস
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো মেয়াদজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান টিভিএলের (TVEL)। প্রথম তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ মূল নির্মাণ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির বর্জ্য বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে রাশিয়া ফেরত নিয়ে যাবে এবং প্রক্রিয়াজাত করে তাদের দেশে মাটির ৪০০ মিটার নিচে পুঁতে রাখবে। এ বিষয়ে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়। তবে বর্জ্য বের করার সঙ্গে সঙ্গেই তা পরিবহন করা হয় না; শীতল করার জন্য রূপপুরেই প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত এটি নিরাপদে সংরক্ষণ করে রাখার সুবিধা রয়েছে।
দাম ও গ্রিড নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত
প্রকল্পের বিলম্ব প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে আগাম বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ ঘোষণা করার সুযোগ নেই। এখন সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও জটিল সময় চলছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে নিবিড় যাচাই করতে হবে। দেরি যা হয়েছে হয়েছে, এখন তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কোনো ভুল করা যাবে না।”
অন্যদিকে, জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত স্পিনিং রিজার্ভের কিছুটা সংকট থাকলেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, শুরুতে কম মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে বলে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বা স্পিনিং রিজার্ভ নিয়ে কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে না। উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পরীক্ষামূলক সরবরাহের পর পিডিবির সাথে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।