১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৮:০৫:১৯ অপরাহ্ন


৬০ বছরে জাহিদ হাসান, জীবনের ভুলের জন্য অনুতপ্ত
বিনোদন ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-১০-০৪ ১৬:৫৯:০২
৬০ বছরে জাহিদ হাসান, জীবনের ভুলের জন্য অনুতপ্ত প্রখ্যাত অভিনেতা জাহিদ হাসান I ছবি: সংগৃহীত


মঞ্চ থেকে রূপালী পর্দার তিন দশকের অবিসংবাদিত রাজত্ব; ষাটতম জন্মদিনে পেছনের স্মৃতির ভেলায় জনপ্রিয় এই অভিনেতা

      ‘বয়স কত হলো জাহিদ ভাই?’—‘৬০।’ আপাতদৃষ্টিতে কথোপকথনটি অত্যন্ত সহজ ও সাধারণ মনে হলেও, প্রখ্যাত অভিনেতা জাহিদ হাসানের নিজের কাছেই সংখ্যাটি যেন চরম অবিশ্বাস্য এক সত্য। রোববার (৪ অক্টোবর ২০২৬) জীবনে সগৌরবে ৬০ বছরে পা রাখলেন বাংলাদেশের মঞ্চ, ক্ষুদ্র পর্দা ও রূপালী চলচ্চিত্রের অসম্ভব জনপ্রিয় এই অভিনেতা। নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে অভিনয়ে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকদের হাসিয়ে, কাঁদিয়ে ও অনাবিল আনন্দে ভাসিয়ে একছত্র ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তিনি। জীবনের ষাটতম বসন্তে এসে পেছন ফিরে তাকানো, জীবনের ফেলে আসা ভুলত্রুটির অনুশোচনা এবং মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে তাঁর বয়ানে।

সিরাজগঞ্জের সম্ভ্রান্ত সাংস্কৃতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা জাহিদ হাসান পরিবারের সব ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। ফলে বয়স ষাটের কোঠা স্পর্শ করলেও পরিবারের সদস্য ও কাছের মানুষের কাছে তিনি সেই চিরচেনা ছোটটিই রয়ে গেছেন। জীবনের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বাইরের পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে আমি বড় জাহিদ কিংবা জাহিদ ভাই হলেও, পরিবারের স্বজনদের কাছে আজও আমি সেই ছোট ছেলেটিই থেকে গেছি। সত্যি বলতে কী, বয়স যে এভাবে ষাটের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা ভাবনার ভেতরেই সচরাচর আসে না।"

বয়সের এই পরিপক্কতায় দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের অতীত ভুলের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন জাহিদ হাসান। অনুশোচনার সুরে তিনি বলেন, "মানুষ মাত্রই ভুল করে। বিগত জীবনে পথ চলতে গিয়ে নিশ্চয়ই অনেক ভুল করেছি। আমার অজান্তে বা কোনো আচরণে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে আমি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে দুঃখিত। জীবনের বাকি দিনগুলোতে যেন সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসতে পারি, সেটাই এখন আমার মূল কাম্য।"

ব্যক্তিগত জীবনে একক উন্নতির চেয়ে সুহৃদদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা জাহিদের চিরকালের। তিনি মনে করেন, "সবাইকে সাথে নিয়ে ভালো থাকার চিন্তাই সমাজের ও একটি দেশের আসল রূপান্তর আনে।" পারিবারিক জীবনে দুই সন্তানের জনক জাহিদ হাসান। তাঁর বড় মেয়ে বর্তমানে লন্ডনের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, আর ছেলে সম্প্রতি এ লেভেল সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ গমনের অপেক্ষায় রয়েছে।

আবেগপ্রবণ হৃদয়ের জাহিদ হাসানের কাছে সুদূর লন্ডনে থাকা মেয়ের ফোন আসলেই বুকের ভেতর এক অজানা হাহাকার জেগে ওঠে। মেয়ে যখন দূর থেকে বলে, "বাবা, তোমাদের ও ঘরের তৈরি খাবার খুব মিস করছি"—তখন দুচোখের কোণ অজান্তেই ভিজে ওঠে বর্ষীয়ান এই তারকার।

জন্মদিনের স্মৃতিমন্থন করতে গিয়ে শৈশবের সোনালী দিনগুলোতে ফিরে যান জাহিদ। সিরাজগঞ্জের বাড়িতে মা নিজ হাতে পায়েস, কলা, চানাচুর আর হরেক রকমের সুস্বাদু খাবার বানিয়ে উদযাপনের রূপ দিতেন। তবে ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডির মেসজীবনে কাটানো একটি জন্মদিনের স্মৃতি তাঁর হৃদয়ে অমলিন। ঢাকার মেসঘরের নোংরা মেঝে ঝাঁট দেওয়ার সময় মেসের এক রুমমেটের আইনজীবী বাবা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, "মন খারাপ করো না পুলক (জাহিদ হাসানের ডাকনাম); একদিন এমন এক শুভদিন আসবে যেদিন পুরো দেশের মানুষ তোমার জন্মদিন উদযাপন করবে।" পরবর্তীতে জাতীয় পরিচিতি ও ভালোবাসা পাওয়ার পর বারবার সেই প্রবীণ ব্যক্তির ভাবনার কথা মনে পড়েছেন বলে জানান জাহিদ।

থিয়েটারের প্রতি অদম্য ভালোবাসা থেকে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে 'নাট্যকেন্দ্র' গঠন এবং থিয়েটারের মেঝে মোছা থেকে শুরু করে কঠিন মেসজীবনের ঘাত-প্রতিঘাতই তাঁকে আজকের পরিণত জাহিদ হাসান হিসেবে গড়ে তুলেছে। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় ত্যাগের মহিমা ও সহমর্মিতা শেখা জাহিদ হাসান মনে করেন, "কষ্টের পর অর্জিত প্রাপ্তির সুখানুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বর্গীয়।"