১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৯:২১:২৩ অপরাহ্ন


মুদির দোকানে আসা ফোনে বদলে যায় জীবন, ৫৬–তে চলে যাওয়া মুশতাকের গল্পটা সিনেমার মতোই!
বিনোদন ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৯-২৬ ১৪:২৩:৫৫
মুদির দোকানে আসা ফোনে বদলে যায় জীবন, ৫৬–তে চলে যাওয়া মুশতাকের গল্পটা সিনেমার মতোই! অভিনেতা মুশতাক খান I ছবি: সংগৃহীত


ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান; মহেশ ভাটের আবিষ্কার, ‘ওয়েলকাম’ ও ‘গদার’ খ্যাত প্রখ্যাত পার্শ্ব অভিনেতার জীবনাবসান

       নায়ক হওয়ার একবুক স্বপ্ন নিয়ে কোনো শক্ত যোগাযোগ কিংবা প্রভাব ছাড়াই মায়ানগরী মুম্বাইয়ে পা রেখেছিলেন তিনি। এমনকি বার্তা আদান-প্রদানের জন্য নিজের বাড়িতে ছিল না কোনো ফোন। কোনো পরিচালক বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খবর পাঠালে সেই সংবাদ পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল পাশের মুদিদোকান, যেখানে প্রতিটি ফোনের বার্তার জন্য দোকানদারকে গুনতে হতো এক টাকা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৫ দিনের মাথায় সেই মুদিদোকানের ফোনেই বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ।

ফোনটি করেছিলেন প্রখ্যাত পরিচালক মহেশ ভাট। আর সেই একটি ফোনকলের সুবাদেই ১৯৮৮ সালে ‘কবজা’ চলচ্চিত্রে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। বলছি বলিউডের জনপ্রিয় ও অত্যন্ত পরিচিত মুখ অভিনেতা মুশতাক খানের কথা। দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে ক্যানসারের সঙ্গে কঠিন লড়াই শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই শক্তিমান শিল্পী।

মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার বাইহার শহরে জন্ম নেওয়া মুশতাক খান কোনো পারিবারিক সুবিধা ছাড়াই এসেছিলেন চলচ্চিত্রে। চিত্রনাট্যকার সেলিম খানের সুপারিশে মহেশ ভাটের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেলেও প্রথম দেখায় কাজ মেলেনি। পরবর্তীতে যোগাযোগ রক্ষার জন্য পাশের মুদিদোকানই ছিল তাঁর প্রধান ভরসা। মহেশ ভাটের ‘কবজা’ ছবিতে ছোট ‘তিওয়ারি’ চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি।

অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে ভাট তাঁকে ‘স্বয়ম’ নামের টেলিফিল্মে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে সুযোগ দেন। এরপর থেকে মহেশ ভাটের ‘আশিকি’, ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’, ‘সড়ক’, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’, ‘গুমরাহ’ ও ‘চাহত’-এর মতো একের পর এক সফল ছবির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। বিশেষ করে ১৯৯৩ সালে ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’ ছবিতে ‘ভগবতী প্রসাদ মিশ্র’ চরিত্রটি তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

তিন দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রধান নায়ক না হলেও বহু স্মরণীয় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেন মুশতাক। ২০০১ সালের অলটাইম ব্লকবাস্টার ‘গদার: এক প্রেম কথা’ এবং দুই দশক পর নির্মিত ‘গদার ২’-এ সানি দেওলের সঙ্গে ‘গুল খান (গুল্লু)’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল দারুণ প্রশংসিত।

তবে কমেডি ধারার চলচ্চিত্রে ২০০৭ সালের ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে ‘বাল্লু’ চরিত্রটি আজও দর্শকের মনে অমলিন। অক্ষয় কুমার, নানা পাটেকর ও অনিল কাপুরের মতো বড় তারকাদের ভিড়েও একজন প্রতিবন্ধী সাবেক হকি খেলোয়াড়ের চরিত্রে তাঁর স্বতন্ত্র হাঁটা ও সংলাপ প্রক্ষেপণ আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বহুল জনপ্রিয় এই চরিত্রের জন্য অন্যান্য তারকাদের স্টাফদের চেয়েও কম—মাত্র ১ লাখ রুপি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন তিনি। তবুও পারিশ্রমিকের অঙ্ক ছাপিয়ে দর্শকদের ভালোবাসাই ছিল তাঁর বড় পাওয়া।

কেবল কমেডি নয়; পুলিশ, প্রতিবেশী, সাধারণ কেরানি থেকে শুরু করে ‘বালা’, ‘বধাই দো’ ও ‘স্ত্রী ২’-এর মতো সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের বহুমুখী অভিনয় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। পাশাপাশি ‘কুছ রং পেয়ার কে অ্যায়সে ভি’সহ একাধিক জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিকেও কাজ করেছেন তিনি।

পেশাগত সফলতার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অতিক্রম করতে হয়েছে এই শিল্পীকে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে উত্তর প্রদেশে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে একটি চক্রের হাতে অপহৃত হন তিনি। ২ লাখ ২০ হাজার রুপি মুক্তিপণ দাবি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলেও পরদিন কৌশলে পালিয়ে পাশের একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে ফেরেন তিনি।

অপহরণের ভয়াবহ স্মৃতি কাটিয়ে পুনরায় অভিনয়ে ফিরলেও শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের কাছে হার মানতে হলো মুশতাক খানকে। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হলেও সম্প্রতি রোগটি পুনরায় মারাত্মক আকারে ফিরে আসে। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী সালমা খান এবং দুই ছেলে মোহাম্মদ আরশাদ খান ও মোহসিন খানকে রেখে গেছেন তিনি। নায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই এসে তারকা হতে না পারলেও, নিজের সাবলীল অভিনয় দিয়ে হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন মুশতাক খান।