১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ১১:২৬:৩২ অপরাহ্ন


জাতিসংঘে বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক প্রথম ভাষণ: গণতন্ত্র, অধিকার ও পানি সুরক্ষার জোরালো আহ্বান
জাতীয় ও বিশেষ প্রতিবেদক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৯-২১ ১৯:৩৫:২৭
জাতিসংঘে বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক প্রথম ভাষণ: গণতন্ত্র, অধিকার ও পানি সুরক্ষার জোরালো আহ্বান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া I ছবি: সংগৃহীত


১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম সাধারণ পরিষদে দেওয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কালজয়ী ভাষণের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

         আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজপরিবার ও জাতীয় রাজনীতিতে চার দশকের এক অনন্য ইতিহাস নতুন আলোয় ফিরে এসেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পর তাঁর সহধর্মিণী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে নিজের প্রথম ভাষণ দেন। জাতিসংঘের নথিপত্রে ৪৮তম অধিবেশনের ১৩তম পূর্ণাঙ্গ সভায় লিপিবদ্ধ সেই ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি কেবল একটি উদীয়মান রূপান্তরকামী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাই তুলে ধরেননি, বরং ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার বৈষম্য নিরসন এবং ফারাক্কা বাঁধজনিত পানিবণ্টন সংকটের মতো জাতীয় জীবন-মরণ ইস্যু বিশ্বমঞ্চে বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।

১. গণতন্ত্র ও টেকসই উন্নয়নের পারস্পরিক রূপরেখা:

জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন—"গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।" তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সদ্য গৃহীত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করছে দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপর। এককভাবে পুঁজির স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সম্পদের সীমাবদ্ধতায় আমরা যখন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি, তখন একা এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; আমাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।" তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) এখতিয়ার সর্বজনীনভাবে গ্রহণের আহ্বান জানান।

২. গঙ্গার পানিবণ্টন ও ফারাক্কা বাঁধ—জীবন-মরণ সংকট:

ভাষণের অন্যতম শক্তিশালী দিক ছিল ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যা এবং ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তাঁর আপসহীন বক্তব্য। বেগম জিয়া উল্লেখ করেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং এগুলোর ওপর বাংলাদেশের সহজাত ও আইনি অধিকার বিদ্যমান। তিনি অভিযোগ তুলে ধরেন, শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধের উজানে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশে ভয়াবহ খরা হয়, আর বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে সৃষ্টি করা হয় কৃত্রিম বন্যা।

স্পষ্ট ভাষায় তিনি বিশ্বমঞ্চে উচ্চারণ করেন, "ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।" তিনি এর ফলে সৃষ্ট মরুকরণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষি ও জীবিকার ক্ষতির যোগসূত্র তুলে ধরে একটি জরুরি ও স্থায়ী চুক্তির জোর দাবি জানান।

৩. পরিবেশ সুরক্ষা ও পাটশিল্পের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব:

পরিবেশদূষণের জন্য উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে দায়বদ্ধ করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক দায়ভার মূলত ধনী রাষ্ট্রগুলোকেই বহন করতে হবে, কারণ বিশ্বদূষণে উন্নয়নশীল দেশের অবদান সামান্য। পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের পাটশিল্পের কথা তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেন যে, কৃত্রিম ও রাসায়নিক তন্তুর আগ্রাসনে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়ছে।

৪. বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও স্বনির্ভর অর্থনীতির ডাক:

বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমতার ভিত্তিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান জানান বেগম জিয়া। তিনি উন্নত দেশগুলোকে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক বাধা দূর করা, উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা দ্রুত সম্পন্ন করা এবং প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। তৎকালীন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশ তৈরির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক সাহায্য কোনো দেশকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর করতে পারে না।

৫. অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি ও সার্কের আঞ্চলিক ভূমিকা:

বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ২০০০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য, ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের মৌলিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নারী ক্ষমতায়নের সফল চিত্র তিনি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তৎকালীন সার্ক (SAARC)-এর চেয়ারপারসন হিসেবে ঢাকার সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের দারিদ্র্য বিমোচন রোডম্যাপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব উল্লেখ করেন।

৬. শরণার্থী সংকট, শান্তি রক্ষা ও ভূ-রাজনীতি:

  • পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমার সংকট: পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়া উপজাতীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাবাসনে ভারতের সঙ্গে চুক্তি এবং মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়ের কথা তুলে ধরে ইউএনএইচসিআর (UNHCR)-এর সহযোগিতায় নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন।

  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা: নামিবিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, কুয়েত, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া ও মোজাম্বিকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘের আর্থিক সংকট কাটাতে ধনী দেশগুলোর সহযোগিতা চান।

  • আন্তর্জাতিক সংকট: বসনিয়ার মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জানান, পিএলও (PLO) ও ইসরায়েলের চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামকে সমর্থন জানান।

৭. শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতি ও চার দশকের ধারাবাহিকতা:

ভাষণের ইতি টানতে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের ১১শ বিশেষ অধিবেশনে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেওয়া কালজয়ী বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। জিয়াউর রহমানের "সাহসী ও সৃজনশীল পদক্ষেপ"-এর বার্তা স্মরণ করে তিনি বলেন, আইনের শাসন ও মানবকল্যাণে সেই বক্তব্য আজও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।

উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে শহীদ জিয়াউর রহমান, ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া এবং আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণের মাধ্যমে একই পরিবারের তিন রাষ্ট্রনায়কের চার দশক ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকার তুলে ধরার এক অনন্য নতুন কূটনৈতিক ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে।