১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৮:৫৯:১৫ অপরাহ্ন


১০০ দিন পার: জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ পরীক্ষা
অনলাইন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৫-২৭ ১৭:২৭:০৪
১০০ দিন পার: জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ পরীক্ষা


একটি নবগঠিত সরকারের প্রথম ১০০ দিন নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস যেমন কাম্য নয়, তেমনি একে পুরোপুরি অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এই সময়কালটি ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় না হলেও সরকারের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, অগ্রাধিকার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিশীলতার একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে, জন-আস্থাকে প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকার কতটা সফল, তার কিছু সংকেত এই সময়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের সামাজিক ক্লান্তি কাটিয়ে দেশের মানুষ যখন কেবল সরকার পরিবর্তনই নয়, বরং রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বাজারের স্থিতিশীলতা, বিচারব্যবস্থায় আস্থা এবং চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে উন্মুখ ছিল, ঠিক তখনই এই নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অনিশ্চয়তা শেষে একটি নির্বাচিত সরকারের এই আগমন স্বাভাবিকভাবেই জনমনে একধরনের স্বস্তি ও রাজনৈতিক পুঁজি তৈরি করেছে, যা সঠিক ব্যবহার না হলে দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবতা

চলতি ১০০ দিনে সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হলো নির্বাচিত কর্তৃত্বের একটি ন্যূনতম পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা। তবে রাজনৈতিক বৈধতাই যে প্রশাসনিক সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না, তা বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই প্রমাণিত। প্রাথমিক ধাপে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্কুল ফিডিং এবং বৃক্ষরোপণের মতো কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের বার্তা দেয়। তবে মূল চ্যালেঞ্জটি ভালো প্রকল্পের অভাব নয়, বরং এর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে নিহিত। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো যদি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া তালিকা, মধ্যস্বত্বভোগী এবং দলীয় আনুগত্যের কবলে পড়ে, তবে তা কেবল পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। একইভাবে, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে নেওয়া মিড-ডে মিল কর্মসূচিতে পচা ডিম বা নিম্নমানের রুটি সরবরাহের মতো ঘটনা রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা এবং নিম্নমানের প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে নির্দেশ করে, যা কঠোর নজরদারি ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে রোধ করা আবশ্যক।

অর্থনৈতিক পরীক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রথম বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই সরকারকে। শুরুতে দাম না বাড়িয়ে জনচাপ সামলানোর চেষ্টা করলেও, স্পষ্ট জনযোগাযোগের অভাবে বাজারে আতঙ্ক ও মজুতের প্রবণতা তৈরি হয়, যার ফলে পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে। এর পাশাপাশি, চলমান হামের প্রাদুর্ভাব সরকারের জন্য আরেকটি কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও টিকার ঘাটতি বা রুটিন ইমিউনাইজেশনের ফাঁকফোকরের মতো পূর্ববর্তী ব্যর্থতা এর পেছনে দায়ী, তবুও দ্রুত হাসপাতাল প্রস্তুতি ও বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এই স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করা বর্তমান প্রশাসনেরই দায়িত্ব। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধ নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত প্রতীকী অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অপরাধ-অর্থনীতি ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি না ভাঙলে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আগামী এক বছরের জরুরি করণীয়

সরকারের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ পরীক্ষা হবে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচনব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত সংস্কার সাধন করা। বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে থেকে রাষ্ট্রীয় দমন ও বিচারহীনতার যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার আলোকেই তাদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। একই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুনভাবে ব্যবহার করা হবে ঐতিহাসিক সুযোগের অপচয়। আগামী এক বছরে সরকারকে মূলত তিনটি জরুরি কাজ করতে হবে: প্রথমত, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে সম্পূর্ণ দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে এনে স্বচ্ছ ডেটাভিত্তিক করা; দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া; এবং তৃতীয়ত, বিচার বিভাগ ও দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের শাখা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের ভারসাম্যের জায়গা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। পরিশেষে বলা যায়, বিএনপি সরকারের এই ১০০ দিন কেবল সাদা-কালো কোনো গল্প নয়, বরং এখানে যেমন উদ্যোগ ও আস্থা রয়েছে, তেমনি বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতিও স্পষ্ট।