উপমহাদেশের সুরসম্রাটের ১২০তম জন্মবার্ষিকী; কুমিল্লা থেকে মুম্বাইয়ের সুররাজ্যে রাজত্ব করার অসামান্য যাত্রা
‘শোনো গো দখিনো হাওয়া’, ‘তুমি এসেছিলে পরশু’ কিংবা ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে’—যুগ যুগ ধরে সুরপিপাসু বাঙালির হৃদয়ে গুঞ্জরিত হয় এসব চিরসবুজ গান। কালজয়ী সুরের জাদুকর শচীন দেব বর্মনের নাম শোনেননি, এমন গানপাগল মানুষ বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে মেলা ভার। আজ ১ অক্টোবর, এই কালজয়ী সংগীতসাধক, সুরকার ও সংগীত পরিচালকের ১২০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯০৬ সালের এই দিনে বাংলাদেশের কুমিল্লার এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি।
উপমহাদেশের আধুনিক সংগীত, ধ্রুপদী গান ও চলচ্চিত্র সংগীতে তাঁর অবদান আজও অনবদ্য ও অতুলনীয়। একাধারে অনন্য গায়ক ও সুরস্রষ্টা শচীন দেব বর্মন তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে শতাধিক চলচ্চিত্রের সুর ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের প্রায় সব প্রথম সারির কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী তাঁর জাদুকরী পরিচালনায় কণ্ঠ দিয়ে নিজেদের ধন্য করেছেন। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, গীতা দত্ত, মান্না দে, আশা ভোসলে, মুকেশ এবং তালাত মাহমুদসহ বহু সুরের নক্ষত্র তাঁর সুরে গেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
শৈশব, শিক্ষা ও কুমিল্লার স্মৃতি শচীন দেব বর্মনের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় ত্রিপুরার আগরতলাস্থ ঐতিহ্যবাহী ‘কুমার বোর্ডিং স্কুল’-এ। পরবর্তীতে তাঁর বাবা তাঁকে কুমিল্লার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকেই তিনি ১৯২২ সালে আইএ (IA) এবং ১৯২৪ সালে সফলতার সাথে বিএ (BA) পাস করেন। কুমিল্লার মাটি ও মানুষের সুরই ছিল তাঁর গানের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা।
সংগীত শিক্ষা ও প্রথম স্বীকৃতি শিল্পী শচীন দেব বর্মনের প্রথম সংগীত শিক্ষক ছিলেন তাঁর পিতা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মন, যিনি নিজে একজন দক্ষ সেতারবাদক ও ধ্রুপদী সংগীতশিল্পী ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি বিশিষ্ট সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে নিষ্ঠার সাথে সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা করেন।
১৯৩৪ সালে অনুষ্ঠিত 'অল ইন্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্স'-এ গান গেয়ে প্রথম সর্বভারতীয় স্তরে সংগীতপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। এরপর ১৯৩৫ সালে 'বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স'-এ তাঁর পরিবেশিত মনমুগ্ধকর ঠুমরি শুনে স্বয়ং ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ ভূয়সী প্রশংসা ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন।
মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগৎ ও বিশ্বজয় ১৯৪০ সালে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধ ও আমন্ত্রণে তিনি মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান এবং হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর সুরারোপিত ‘মাটির ঘর’, ‘শিকারী’, ‘দিল কি রানি’, ‘মিস ইন্ডিয়া’, ‘তেরে ঘর কে সামনে’, ‘ক্যায়সে কহুঁ’, ‘জয়তী’, ‘প্রেম পূজারী’ ও ‘গাইড’-এর মতো শত শত কালজয়ী চলচ্চিত্রের গান সর্বকালের সেরা জনপ্রিয়তার মর্যাদা পায়।
স্বীকৃতি ও প্রয়াণ সংগীতে অতুলনীয় সৃজনশীলতার জন্য তিনি লাভ করেছেন ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননা, ‘ফিল্মফেয়ার বেস্ট মিউজিক ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড’, ‘সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘এশিয়া ফিল্ম সোসাইটি অ্যাওয়ার্ড’-সহ দেশি-বিদেশি অজস্র সম্মাননা।
বাংলা ও হিন্দি সংগীতে অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তবে তাঁর রেখে যাওয়া সুরের অমূল্য সম্ভার আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে জাগ্রত।