বিনিয়োগকারীদের কোটি ডলার আত্মসাৎ করে পনজি স্কিমে বিলাসী জীবন; ১১ বছরের জেল ও ৩১ মিলিয়ন ডলার জরিমানা
বিনিয়োগকারীদের বিপুল অংকের অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণামূলক 'পনজি স্কিম' পরিচালনা এবং ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিনিয়োগ উপদেষ্টা সিদ্ধার্থ জাওহারকে ১১ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছে মার্কিন আদালত। অপরাধের ভয়াবহতায় স্তম্ভিত করার মতো তথ্য হলো—তাঁর পাতা প্রতারণার জালে পা দিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন আমেরিকান ফুটবল তারকা ও পপ কুইন টেইলর সুইফটের স্বামী ট্র্যাভিস কেলসি। মার্কিন বিচার বিভাগ এবং সেন্ট লুইসের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা অ্যাটর্নির কার্যালয় এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
৩৮ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ জাওহার টেক্সাসভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘সুইফটআর্ক ক্যাপিটাল এলএলসি’ (Swiftarc Capital LLC)-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা অংশীদার ছিলেন। আদালতের বিচারিক নথি ও মার্কিন অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাওহারের পরিকল্পিত ও সূক্ষ্ম প্রতারণার শিকার হয়েছেন মিসৌরি সহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রায় ৬৪ জন হেভিওয়েট বিনিয়োগকারী। আদালতে শুনানির সময় মার্কিন ফুটবল তারকা ট্র্যাভিস কেলসির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসলেও, তিনি ঠিক কত মিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন সেই সুনির্দিষ্ট অঙ্ক এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নথি বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০১০ সালে ‘সুইফটআর্ক ক্যাপিটাল’ প্রতিষ্ঠা করেন জাওহার। শুরুর দিকে বৈচিত্র্যময় সংস্থায় অর্থ লগ্নির কথা বললেও ২০১৫ সাল থেকে গ্রাহকদের প্রায় ৯৯ শতাংশ মূলধন ‘ফিলিপ মরিস পাকিস্তান’ (PMP) নামক মাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে পিএমপির শেয়ারের মূল্য বাজারধসের কারণে হু হু করে কমে গেলেও জাওহার তা বিনিয়োগকারীদের কাছে গোপন রাখেন। উল্টো শেয়ারের মূল্য কৃত্রিমভাবে বেশি দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত ভুয়া মুনাফা ও লভ্যাংশের বানোয়াট হিসাব পাঠাতেন তিনি।
তদন্তকারীদের তথ্যমতে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাওহার গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করলেও বাস্তবে মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে পুরোনো বিনিয়োগকারীদের পাওনা বা তথাকথিত লভ্যাংশ পরিশোধ করতেন তিনি, যা ক্লাসিক্যাল ‘পনজি স্কিম’ নামে পরিচিত। আত্মসাৎ করা এই বিপুল অর্থ দিয়ে জাওহার চার্টার্ড বিমানে ভ্রমণ, নিউইয়র্ক ও অস্টিনে আলিশান অ্যাপার্টমেন্ট, দামি রেস্তোরাঁ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে টেক্সাস স্টেট সিকিউরিটিজ বোর্ড জাওহারের বিনিয়োগ লাইসেন্স বাতিল করে আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও, সেই আদেশ গোপন রেখে জাওহার অবৈধভাবে নতুন তহবিল সংগ্রহ অব্যাহত রাখেন। এমনকি নিষেধাজ্ঞা জারির মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় এক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে আরও ১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সেন্ট লুইসের গ্র্যান্ড জুরি তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি ওয়্যার ফ্রডের ৩টি অভিযোগে আদালতে দোষ স্বীকার করেন। মামলার যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট বিচারক জ্যাকারি এম ব্লুস্টোন অভিযুক্ত জাওহারকে ১১ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের ৩১ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। রায় ঘোষণাকালে বিচারক জাওহারের বিশ্বাসঘাতকতা, ডিজিটাল প্রমাণ মুছে ফেলার চক্রান্ত এবং এফবিআই তদন্তে বাধা দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। নথিতে আরও জানা যায়, জাওহার ২০০৫ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন।