১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৯:০০:৩৬ অপরাহ্ন


নেপথ্যের গল্প: ৫-৮ আগস্ট ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবনে যা যা ঘটেছিল
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৮-০৬ ২০:৩৬:১৫
নেপথ্যের গল্প: ৫-৮ আগস্ট ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবনে যা যা ঘটেছিল


পর্দার আড়ালের রাজনৈতিক দেনদরবার, সেনাসদরে জরুরি বৈঠক এবং বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঐতিহাসিক ঘটনার দলিল

      চরম উত্তাল পরিস্থিতি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটেছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের। ৫ আগস্ট পদত্যাগ ও দেশত্যাগ থেকে শুরু করে ৮ আগস্ট রাতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথগ্রহণ—এই চার দিন বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রে কী ঘটেছিল? ক্যান্টনমেন্টের সেনাসদর থেকে শুরু করে বঙ্গভবনের দরবার হল পর্যন্ত পর্দার আড়ালের সেই ইতিহাস উঠে এসেছে সরাসরি বৈঠকে উপস্থিত থাকা প্রত্যক্ষদর্শী রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও ছাত্রনেতাদের বয়ানে।

৫ আগস্ট: সেনাপ্রধানের ফোন ও ক্যান্টনমেন্টে রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠক


৫ আগস্ট রাত ১২টা ২০ মিনিটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ফোন করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের সাবেক নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরকে। সকালে তাঁকে সেনাসদরে দেখা করার অনুরোধ জানান সেনাপ্রধান।

  • সকালের বৈঠক: ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় সেনাপ্রধানের বাসভবনে আধা ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। সেনাপ্রধান ফজলে এলাহী আকবরকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত এক জায়গায় এনে আলোচনার দায়িত্ব দেন।

  • রাজনীতিবিদদের আমন্ত্রণ: সেনাসদর থেকে বের হয়ে ফজলে এলাহী আকবর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করেন। এরপর জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

  • আসিফ নজরুলের শঙ্কা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুলের ফোনে সেনাবাহিনী থেকে কল গেলে প্রাথমিক আতঙ্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে মির্জা ফখরুল ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে পরামর্শ করে দুপুর ১টার পর তিনি ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছান।

  • শেখ হাসিনার প্রস্থান: দুপুর ৩টা ৯ মিনিটে শেখ হাসিনাকে বহনকারী হেলিকপ্টার/বিমান উড্ডয়ন করে এবং ৩টা ৫০ মিনিটে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত করেন।

ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন: ‘ক্যান্টনমেন্ট থেকে দেশের ভবিষ্যৎ ঠিক হবে না’


ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যখন সংসদ ভেঙে দেওয়া ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বৈঠক চলছিল, তখন রাজপথে অবস্থানরত ছাত্রনেতাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়।

বেলা ১১টার দিকে চাঁনখারপুলে অবস্থানকালে ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া খবর পান যে নেতারা সেনাসদরে বসেন। সামরিক নেতৃত্বাধীন কোনো একতরফা ব্যবস্থা ঠেকাত তাৎক্ষণিকভাবে ফেসবুকে লাইভে এসে আসিফ মাহমুদ ঘোষণা দেন—“দেশের ভবিষ্যৎ ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঠিক করা হবে না।” তবে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও জোর দিয়ে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের অংশীদারদের না রেখে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

মাগরিবের পর রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

বঙ্গভবনের রাতের বৈঠক (৫ আগস্ট)আলোচিত বিষয় ও সিদ্ধান্ত
খালেদা জিয়ার মুক্তিআসিফ নজরুল ও সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রপতি অবিলম্বে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেন।
আকাশসীমা বন্ধহেভিওয়েট ব্যক্তিদের পলায়ন ঠেকাতে বিমানবাহিনী প্রধানের নির্দেশে বাংলাদেশের আকাশসীমা তাৎক্ষণিক বন্ধ ঘোষণা।
আইনশৃঙ্খলা ও আয়নাঘরথানা সুরক্ষা এবং ডিজিএফআই প্রধানকে গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ থেকে সব বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেন সেনাপ্রধান।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার নেপথ্য


ক্ষমতার শূন্যতা দূর করতে শেখ হাসিনার পতনের কয়েক দিন আগে থেকেই বিকল্প সরকারপ্রধানের খোঁজ শুরু করেছিলেন ছাত্রনেতারা।

  • যোগাযোগের মাধ্যম: ১ আগস্ট সুজনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সহায়তায় ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

  • ৩ আগস্টের ফোনালাপ: ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ ৩ আগস্ট বিদেশে অবস্থানরত ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নেতৃত্ব দেওয়ার অনুনয় করেন। শুরুতে ড. ইউনূস রাজি না হয়ে অন্য কাউকে খোঁজার পরামর্শ দিলেও ছাত্ররা এতে অনড় থাকেন।

  • ৫ ও ৬ আগস্টের সম্মতি: ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর সন্ধ্যায় পুনরায় ফোনে আলোচনার পর ড. ইউনূস অবশেষে ইতিবাচক সাড়া দেন। বিএনপি ও জামায়াতসহ প্রধান দলগুলোও এ প্রস্তাবে সম্মতি জানায়।

উপদেষ্টা পরিষদ গঠন ও ৮ আগস্টের শপথ


৬ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টায় নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে চারজন ছাত্রনেতা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে দীর্ঘ ৫ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। ড. ইউনূসের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়।

ড. ইউনূসের পাঠানো তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর ১৩ জন উপদেষ্টা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দেশে একটি সফল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের যাত্রা শুরু করেছিল, যা পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ প্রশস্ত করে।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার বাংলা