১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৮:০৮:২১ অপরাহ্ন


আর্জেন্টিনার কাছে হেরেও ফুটবল বিশ্বের হৃদয় জয় করল বীরত্বগাঁথা কেপ ভার্দে
ক্রীড়া প্রতিবেদক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৭-০৪ ১৬:১৩:২৪
আর্জেন্টিনার কাছে হেরেও ফুটবল বিশ্বের হৃদয় জয় করল বীরত্বগাঁথা কেপ ভার্দে


মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নীল জার্সির ফুটবলারদের কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন, আবার কেউ দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। তাঁদের চোখের জল যেন কেবল পরাজয়ের বেদনা ছিল না, বরং তা ছিল অদম্য সাহস এবং বীরত্বের এক অনন্য উপাখ্যান। বিশ্বকাপের এই নকআউট ম্যাচের ফলাফল জানাচ্ছে কেপ ভার্দে হেরে গেছে, তবে ফুটবল তো কেবল স্কোরলাইনের গল্প নয়। এই রোমাঞ্চকর ম্যাচ শেষে ফুটবলবিশ্ব দেখল—সব পরাজয় আসলে পরাজয় নয়। কাতার বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের এই ছোট্ট দ্বীপদেশটি। তারা প্রমাণ করে গেছে, ফুটবলের মাঠে অসম্ভব বলে আসলেই কিছু নেই।

র‍্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান ঘুচিয়ে মাঠজুড়ে নীল দেয়াল ও ভোজিনিয়ার বীরত্ব

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬৭ নম্বরে থাকা দলটির ইতিহাস, তারকাখ্যাতি, অর্থ কিংবা পরিকাঠামো—কোনো দিক থেকেই আর্জেন্টিনার ধারেকাছে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু মাঠের ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে সেই পরিসংখ্যানের কোনো ছাপ ছিল না। নিজেদের অর্ধে নিরেট রক্ষণ, হাইলাইন ডিফেন্স আর মাঝমাঠে লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দি করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল কেপ ভার্দে। আর্জেন্টিনার প্রতিটি আক্রমণের সামনে যেন এগারোজন নয়, পুরো একটি জাতি রক্ষণে নেমে নীল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর সেই রক্ষণ দেয়ালের শেষ প্রহরী হিসেবে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করেছেন তাঁদের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে আগের ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও একের পর এক দুর্দান্ত সেভে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে বারবার হতাশ করেছেন তিনি।

পিছিয়ে পড়েও কাবরালের বিশ্বসেরা গোল ও আত্মঘাতী গোলের ট্র্যাজেডি

ম্যাচের ২৯ মিনিটে লিওনেল মেসির অসাধারণ এক ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেলে যেকোনো নবীন দল ভেঙে পড়তে পারত। কিন্তু কেপ ভার্দে দমে যায়নি, তারা দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফিরে আসে। ম্যাচে একবার নয়, দু-দুবার পিছিয়ে পড়েও সমতা ফরায় তারা। অতিরিক্ত সময়ে আবারও পিছিয়ে পড়ার পর কাবরালের চোখধাঁধানো এক গোল পুরো ফুটবলবিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। দূরূহ এক কোণ থেকে করা কাবরালের এই গোলটিকে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভাগ্য কেপ ভার্দের পক্ষে ছিল না। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর একটি জোরালো হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার ডিনেই বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। এই দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলের মুহূর্তটিই শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দের রূপকথার সমাপ্তি টেনে দেয়।

সাবেক তারকাদের প্রশংসা ও ফুটবলের ইতিহাসে স্থায়ী ঠিকানা

হারলেও ফুটবল পণ্ডিত ও সাবেক তারকাদের মন জয় করে নিয়েছে কেপ ভার্দে। স্কটল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার জেমস ম্যাকফ্যাডেন বলেন, "কেপ ভার্দে হেরেছে, কিন্তু জিতেছে। তারা সাহস, ঐক্য আর নিজেদের ওপর অবিচল বিশ্বাসের এক অসাধারণ উদাহরণ রেখে গেছে। এই বিশ্বকাপের গল্প যদি একটি দলকে নিয়ে লেখা হয়, তবে সেটি কেপ ভার্দে।" অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা গ্যারি নেভিলের চোখে এটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক আন্ডারডগ পারফরম্যান্স। আর্জেন্টিনা হয়তো শেষ ষোলোতে পা রেখেছে, কিন্তু ফুটবল ইতিহাস দীর্ঘদিন মনে রাখবে এই ছোট্ট দ্বীপদেশের লড়াইকে, যারা বিশ্বসেরাদের সামনে মাথা নত না করে কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় জয় করে বিদায় নিয়েছে।