শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ শিল্পকারখানার শ্রমিকেরা এখনো তাঁদের পবিত্র ঈদুল আজহার বোনাস পাননি। দেশের আটটি প্রধান শিল্প অঞ্চলের ১০ হাজারের বেশি কারখানার ওপর পরিচালিত শিল্প পুলিশের সর্বশেষ জরিপে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল রোববার (২৪ মে) বিকেল চারটা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ৩৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ কারখানা তাদের শ্রমিকদের বোনাস পরিশোধ করেনি। শুধু বোনাসই নয়, ৫ শতাংশ কারখানায় এখনো গত এপ্রিল মাসের বকেয়া বেতনই পরিশোধ করা হয়নি, যা উৎসবের মুখে শ্রমজীবী মানুষদের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
অথচ দেশের সব কারখানায় শ্রমিকদের ঈদ বোনাস গত ২১ মে’র মধ্যে এবং মাসিক বেতন নির্ধারিত তারিখে আবশ্যিকভাবে পরিশোধের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গত ১৪ মে ঢাকার সিরড্যাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) এবং আরএমজিবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের যৌথ সভায় মন্ত্রী এই কড়া নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব শ্রমিকের বেতন-বোনাস না পাওয়ার এই নিয়মিত সংকটকে মালিকদের একটি অংশের চরম গাফিলতি বলে মনে করছেন শ্রমিকনেতারা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে বেতন-বোনাস না দিলে মালিকদের কোনো জবাবদিহি বা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় না বলেই প্রতি ঈদে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী উন্নতি হয় না।
শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্য ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট—এই আটটি শিল্পাঞ্চলের মোট ১০ হাজার ২৩৮টি শিল্পকারখানা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বিকেল চারটা পর্যন্ত ৫৩৫টি কারখানার শ্রমিকদের গত এপ্রিল মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে, যার মধ্যে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানই রয়েছে ১১৫টি। বোনাস পরিশোধের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৯৩টি অর্থাৎ ৬৩ শতাংশ কারখানা বোনাস দিলেও বাকি রয়ে গেছে ৩ হাজার ৭৪৫টি কারখানার বোনাস। এর মধ্যে শিল্প পুলিশের নজরদারিতে থাকা বিজিএমইএর ১ হাজার ৭৯০টি কারখানার মধ্যে ৩৫ শতাংশ এবং বিকেএমইএর ৭০৮টি কারখানার মধ্যে ৩৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গতকাল পর্যন্ত ঈদ বোনাস দেয়নি।
অবশ্য তৈরি পোশাক ও নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন দুটির হিসাব কিছুটা ভিন্ন এবং তাঁরা দ্রুত এই সংকট সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, তাদের সচল ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ৯২ শতাংশ ইতিমধ্যেই বোনাস দিয়েছে এবং ৫৩২টি কারখানা চলতি মে মাসের আংশিক অগ্রিম বেতনও পরিশোধ করেছে। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, মূলত দুটি কারখানার বেতন-বোনাস নিয়ে সমস্যা ছিল, যার মধ্যে একটির সমাধান হয়েছে এবং অন্যটির চেষ্টা চলছে। বাকি থাকা কারখানাগুলো আজ সোমবার ও আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে সব পরিশোধ করে ছুটি দিয়ে দেবে। অন্যদিকে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, তাদের সচল ৭৮৮টি সদস্য কারখানার মধ্যে ৯৯ দশমিক ১১ শতাংশ গত মাসের বেতন দিয়েছে এবং ৮০ শতাংশ কারখানা চলতি মাসের ১০ বা ১৫ দিনের অগ্রিম বেতন মিটিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছু কারখানা আজ সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার ছুটির সময় বোনাস বুঝিয়ে দেবে।
শিল্পমালিকদের দাবি, মাত্র চার সপ্তাহের ব্যবধানে এপ্রিলের পুরো বেতন, ঈদ বোনাস এবং চলতি মে মাসের আংশিক অগ্রিম বেতন একসাথে দিতে গিয়ে অনেক শিল্পকারখানা সাময়িকভাবে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। তবে মালিকদের এই যুক্তি মানতে নারাজ শ্রমিক সংগঠনগুলো। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকেরা যেখানে সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ পাচ্ছেন, সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাধারণ শ্রমিকের ঘাম ঝরানো বেতন ও বোনাসের টাকা পরিশোধ না করাটা অত্যন্ত লজ্জাজনক।