ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী। যদি কোনো কারণে এই সরু পথটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব হবে অনেকটা বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী কেটে দেওয়ার মতো। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই প্রণালীটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ। এটি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারে থাকা তেলের দাম মুহূর্তেই ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।
তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই পথটি অপরিহার্য। কাতার থেকে আসা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি এই পথ দিয়েই এশিয়া ও ইউরোপে পৌঁছায়। ফলে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হলে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন থমকে যেতে পারে এবং বড় বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। বিশেষ করে এশিয়ার পরাশক্তি চীন, ভারত ও জাপান তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের খরচ ও বীমার হার কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি হবে এক বড় ধরনের দুঃস্বপ্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথেই দেশে পরিবহন খরচ ও চাষাবাদের ব্যয় বাড়বে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির জাহাজ ভাড়াও অনেক বেড়ে যাবে। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া মানে কেবল একটি জলপথ বন্ধ হওয়া নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক মন্দার সূচনা করা। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো তাই বর্তমানে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে যেন এই কৌশলগত পথটি কোনোভাবেই যুদ্ধের শিকারে পরিণত না হয়।