১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৩:৫৫:১৯ অপরাহ্ন


ভারতে শিক্ষার্থী আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা কে এই নেহা বোরা?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-১০-০৮ ১৬:৩৩:৩৫
ভারতে শিক্ষার্থী আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা কে এই নেহা বোরা? নেহা বোরাফাইল ছবি: রয়টার্স


অনশন, স্লোগান ও থিয়েটারে অন্যায়ের প্রতিবাদ; জেএনইউর পিএইচডি শিক্ষার্থী নেহা বোরা এখন ভারতের ছাত্র আন্দোলনের প্রধান রূপকার

      কখনো কাঁটাতারে ঘেরা ব্যারিকেডের ওপর চড়ে প্রতিবাদী গর্জন, কখনো যন্তর মন্তরে একটানা ২৩ দিনের আমরণ অনশন, আবার কখনো রসিকতা কিংবা গান গেয়ে আন্দোলনের মাঠে নতুন প্রাণের সঞ্চার—সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজপথে ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের রূপকার হিসেবে উঠে এসেছে ২৯ বছর বয়সী এক প্রতিভাবান তরুণীর নাম। তিনি নেহা বোরা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বর্তমানে সমগ্র ভারতের শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে আক্ষরিক অর্থেই আন্দোলনের ‘পোস্টার গার্ল’ হয়ে উঠেছেন এই ছাত্রনেত্রী।

উত্তরাখন্ডের খাটিমার অধিবাসী নেহা বোরা বর্তমানে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ‘স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকস’-এ থিয়েটার ও পারফরম্যান্স বিষয়ে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত। একই সঙ্গে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা নেহার মূল শক্তি তাঁর থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার মেলবন্ধন।

২০২৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ও এআইএসএর যৌথ আহ্বানে ভারতে সর্বভারতীয় পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের প্রতিবাদে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে যে ৬ জন শিক্ষার্থী অনশনে বসেন, নেহা ছিলেন তাঁদের প্রধান মুখ। অনশনের ২৩ দিনে তাঁর সাড়ে ৭ কেজি ওজন কমে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে যায়। তবে দমে যাননি তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট (ডার্ক হিউমার) ও ভিডিওর মাধ্যমে মোদি সরকারের ‘ক্ষমতার ক্ষুধা’র কঠোর সমালোচনা করে আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেন তিনি। ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর তাঁর পোস্ট করা উক্তি—‘আমি যদি নাচতে না পারি, তাহলে সেটা আমার বিপ্লব নয়’—সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিবালের সঞ্চালনায় ‘দিল সে’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নেহা বোরা স্পষ্ট জানান, এটি কেবল কোনো একক ব্যক্তির পদত্যাগের বিষয় নয়, বরং ব্যবস্থার পরিবর্তন ও সরকারের ঔদ্ধত্য ভাঙার লড়াই। এর অংশ হিসেবে আগস্টে তিনি ভারতে তরুণদের একতাবদ্ধ করতে ‘জেন-জি রাইজিং’ নামক দেশব্যাপী পদযাত্রা ও গণসংযোগ কর্মসূচি পরিচালনা করেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একটি রক্ষণশীল ও হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সমর্থক সেনা পরিবার থেকে এসে বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর পরিবার সহজে মেনে নেয়নি। এ ছাড়া চলতি বছরের ৭ আগস্ট ঝাড়খন্ডের রাঁচিতে পরীক্ষা অনিয়মবিরোধী আন্দোলনে ঝাড়খন্ড বিধানসভা অভিমুখে যাত্রাকালে উমর খালিদের সমর্থনে কথা বলার অপরাধে এক যুবক তাঁর মুখে কালি ছুড়ে মারে। তবে সেই কালিমাখা মুখ নিয়েই গর্জে উঠে নেহা জানান, এই কালি তাঁর প্রতিবাদের অলংকার। সর্বশেষ ২৫ সেপ্টেম্বর ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও দমানো যায়নি এই তরুণ নেতৃত্বকে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ অনশনের পর মেয়ের অবিচল সংকল্প দেখে উত্তর প্রদেশ থেকে দৌড়ে এসেছিলেন তাঁর মা। আন্দোলন, শিল্প ও রাজনীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে নেহা বোরা আজ কেবল জেএনইউর শিক্ষার্থী নন, বরং ভারতের কোটি ক্ষুব্ধ ও অধিকারবঞ্চিত তরুণের অদম্য কণ্ঠস্বর।