১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৪:৫৯:১৩ অপরাহ্ন


টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে পাইলট প্রকল্প, জনমনে নতুন আশার সঞ্চার
পরিবেশ ও জাতীয় ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৯-১৫ ১৭:২৯:১১
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে পাইলট প্রকল্প, জনমনে নতুন আশার সঞ্চার ছবি: সংগৃহীত


পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত পদক্ষেপ; অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিকর প্লাস্টিক-জাল বন্ধে কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি

 ‘ছয় কুড়ি বিল আর নয় কুড়ি কান্দা, টাঙ্গুয়ার হাওরে আমরার জীবন বান্ধা’—হাওরপাড়ের মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রবিন্দু এই টাঙ্গুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘রামসার সাইট’ খ্যাত এই প্রাকৃতিক জলাভূমি রক্ষায় এবার নেওয়া হয়েছে বিশেষ Pilot Project ও সমন্বিত উদ্যোগ, যা স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

হাওরের ৮৮টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রার একমাত্র ভরসাস্থল এই টাঙ্গুয়ার হাওর। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ৩৮টি পাহাড়ি ঝরনা এসে মিলেছে এই হাওরে। দেশীয় মাছের প্রধান প্রজননক্ষেত্র হওয়ায় এটিকে বলা হয় ‘মাদার ফিশারিজ’। শীত মৌসুমে লাখ লাখ দেশি ও পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এখানকার পরিবেশ। তবে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের বিস্তার, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাওরে ১৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৪১ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি ও ২১ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। পাশাপাশি অস্তিত্বের ঝুঁকিতে থাকা ২৬ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও বিরল প্যালাসার ফিশ ইগলের আবাসস্থল এটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবহেলা ও পলি জমার কারণে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে চিতল, মহাশোল, নানিদ, সরপুঁটি, বাগাড় ও রিটার মতো ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছ।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি সুনামগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক নীতি-নির্ধারণী সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, "হাওরের সংকট কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। খনন, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, মাছ ও কৃষি উৎপাদন রক্ষা, বর্জ্য নিষ্কাশন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।"

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানিয়েছেন, "২০২৫ সালের সরকারি হাওর সুরক্ষা আদেশ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে ৪.৫ ইঞ্চির নিচে ছিদ্রযুক্ত নিষিদ্ধ জাল ও চায়না দুয়ারি স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।"

এছাড়া হাওর এলাকা প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মোহাইমিনুল হক জানান, হাউজবোট মালিকদের সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার এবং নির্ধারিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে টেকেরঘাট এলাকায় একটি আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি হাওরের প্রাকৃতিক রূপ ও পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ব্যাপকভাবে হিজল ও করচ গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার টাঙ্গুয়ার হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ECA) ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে ২০০০ সালের ১০ জুলাই এটি বিশ্বজুড়ে ঐতিহ্যবাহী রামসার সাইট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।