১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৪:৫৮:২৮ অপরাহ্ন


উত্তর কোরিয়ায় হঠাৎ বিলাসিতার জোয়ার, কিমের এই নতুন কৌশলের নেপথ্যে কী?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৯-১৪ ১৫:৪৫:৫৮
উত্তর কোরিয়ায় হঠাৎ বিলাসিতার জোয়ার, কিমের এই নতুন কৌশলের নেপথ্যে কী? ছবি: সংগৃহীত


রেস্তোরাঁ, শপিং মল ও ওয়ানসান কালমা সৈকতকেন্দ্র কেন্দ্র করে ৮০ লাখ মধ্যবিত্তের সঞ্চয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার ছক

       আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে উত্তর কোরিয়া বললেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া আর নানা আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের চিত্র। তবে এই সব সামাজিক ও সামরিক আবহের আড়ালে বন্ধ দরজার দেশটিতে এখন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বিনোদন ও উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ। রাজধানী পিয়ংইয়ং থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান শহরে তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল শপিং মল, রিসোর্ট, ওয়াটার পার্ক, রেস্তোরাঁ এবং এমনকি পোষা প্রাণীর আধুনিক সেবা কেন্দ্র। আর এই নজিরবিহীন বিলাসিতার জোয়ারের মূল নেপথ্যে রয়েছেন দেশটির সুপ্রিম লিডার কিম জং উন।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, চীনের বাণিজ্যিক তথ্য, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং সম্প্রতি দেশটি ত্যাগকারী ও পর্যটকদের প্রদত্ত তথ্যে এই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। চীনা শুল্ক বিভাগের ডেটা অনুযায়ী, গত এক দশকে উত্তর কোরিয়ায় বডি ম্যাসাজ সামগ্রী আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪০ গুণ এবং ব্যায়ামের আধুনিক যন্ত্রের আমদানি ৬০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ব্যাটারিচালিত বাম্পার কার, দামি ঘড়ি ও পিয়ানোর মতো বিলাসদ্রব্য আমদানিতে জোয়ার এসেছে।

সম্প্রতি চালু হওয়া ‘রিউগিয়ং গোল্ডেন প্লাজা’ ও ‘রাংনাং এগুক কুমগাং সার্ভিস কমপ্লেক্স’-এ দেখা মিলছে রোলেক্স, ওমেগা ও হুয়াওয়ের মতো আন্তর্জাতিক বহুজাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য। পাশাপাশি ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে চালু হওয়া সুবিশাল ‘ওয়ানসান কালমা’ সৈকতকেন্দ্রে গত এক বছরেই তিন লাখেরও বেশি স্থানীয় নাগরিক ভ্রমণ করেছেন।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপে নাগরিকদের কেবল সুখে রাখার কোনো মানবিক উদ্দেশ্য নেই। বরং কিম জং উনের আসল লক্ষ্য হলো উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অঘোষিত ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে জমে থাকা ব্যক্তিগত পুঁজি ও সঞ্চিত অর্থ রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি তহবিলে ফেরত আনা। এতে সাধারণ মানুষের অর্থ অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাবে, সরকারের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’র তথ্য মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি, রাশিয়ার কাছে খনিজ সম্পদ রপ্তানি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সেনা পাঠিয়ে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করেছে উত্তর কোরিয়া। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুডিগার ফ্রাঙ্কের মতে, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের একটি সক্ষম মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হয়েছে। কিমের এই নতুন ভোগবাদী নীতি মূলত তাদের জমানো অর্থ খরচের পথ তৈরি করে দিচ্ছে।

তবে বিশ্লেষক ও দেশত্যাগীদের মতে, বিলাসিতার এই সুবাতাস সর্বসাধারণের জন্য নয়। এটি কেবল পিয়ংইয়ংয়ের উচ্চবিত্ত ও শাসকশ্রেণীর অনুগত অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, অভ্যন্তরীণ বাজারে সাময়িক ভোগ-বিলাসিতার এমন সুযোগ তৈরি করে কিম প্রশাসন আসলে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ রোধ করার জন্য সময় কিনে নিচ্ছেন মাত্র, যা দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পূর্ণ অনুগত সমাজ তৈরিতে কতটা কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে।