১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ১০:২১:১৮ অপরাহ্ন


প্রবল গণপ্রতিরোধের মুখে চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনার স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ
অনলাইন ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৮-০৪ ১৯:৪১:০৩
প্রবল গণপ্রতিরোধের মুখে চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনার স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয় বাংলাদেশ ছবি: সংগৃহীত


১৬ বছরের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের পতন; কোটি জনতার উল্লাসে ‘৩৬ জুলাই’ রচনা করল ঐতিহাসিক স্বাধীনতা


        ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে দীর্ঘ ১৬ বছরের ভয়াবহ স্বৈরশাসনের। বাংলাদেশ রক্ষা পায় এক ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কবল থেকে।


স্বৈরাচারী শাসনামলে শেখ হাসিনা অহংকার করে বারবার বলতেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। এমনকি ২০২৪ সালের ২২ জুলাই আন্দোলন চলাকালেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সেই একই দাবির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তবে সেই বক্তব্যের ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় দেশজুড়ে কোটি মানুষের প্রচণ্ড ঘৃণা, বিক্ষোভ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।




গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক অর্জন ও ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মাইলফলক


চব্বিশের ৫ আগস্ট একদিকে যেমন পরম বিজয়ের, অন্যদিকে অসংখ্য স্বজনহারা পরিবারের করুণ আর্তনাদের। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, এ বিজয় অর্জনে হাজারো শহীদ, ২৩ হাজারেরও বেশি আহত, সাত শতাধিক মানুষ দৃষ্টিহারা এবং অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেন।


৫ আগস্ট পতন নিশ্চিত হওয়ার পরও স্বৈরাচারের অনুগত বলয় ও সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে বহু মানুষ প্রাণ হারান। বর্তমানে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে।


  • ৬টি মামলার রায়: ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছে। রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।


  • চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য: ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাসসকে জানান, সেনসিটিভ মামলাগুলোতে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে ঐতিহাসিক রায় দেওয়া হয়েছে, যা শহীদ ও আহতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রমাণ। বাকি বিচার কাজগুলোও দ্রুত সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে।




যেভাবে অনিবার্য হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদের পতন


২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন। এরপর ২০১৪ সালের বর্জনমূলক ১৫৩ প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার হরণ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা হয়। সেই সাথে ‘আয়নাঘর’, গুম, খুন এবং বিরোধী মতের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়নের অবর্ণনীয় নজির স্থাপন করা হয়।


নির্বাচনের বছরনির্বাচনের ধরণ ও ইতিহাস
২০১৪ (১০ম জাতীয় সংসদ)প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন; ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়
২০১৮ (১১শ জাতীয় সংসদ)সর্বজনবিদিত ‘রাতের ভোট’; ব্যালট বাক্স আগেই ভর্তি
২০২৪ (১২শ জাতীয় সংসদ)স্বপ্রণোদিত ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন; শীর্ষ বিরোধী নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ রাখা



কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানের ‘৩৬ জুলাই’


২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট ও শান্তিপূর্ণ দাবির প্রতি স্বৈরাচারের অবহেলা, দমন-পীড়ন এবং ক্যাডার বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে নৃশংস হামলার কারণে আন্দোলনটি ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে’ রূপ নেয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, আন্দোলন দমনে নির্বিচার গুলিতে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত ও ২০,০০০ মানুষ আহত হন।


আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্টের দিনটিকে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন—যা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার পতনের একদফা দাবির চূড়ান্ত বিজয়ে রূপ নেয়।


রাজপথ কাঁপানো সেই অমর স্লোগানসমূহ


আন্দোলনের দিনে ছাত্র-জনতার মুখে মুখে উচ্চারিত স্লোগানগুলো পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও অধিকার আদায়ের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়:


  • মেধা ও অধিকারের দাবি: ‘কোটা না মেধা? মেধা! মেধা!’, ‘চাইলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার!’


  • প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ: ‘আমার ভাই মরল কেন? প্রশাসন জবাব চাই!’, ‘ভয় পেলে শেষ, লড়লে বাংলাদেশ!’


  • পতনের একদফা স্লোগান: ‘এক দুই তিন চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়!’, ‘দফা এক, দাবি এক, হাসিনা সরকারের পতন!’


  • তারেক রহমানের ঐতিহাসিক আহ্বান: ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ; যদি তুমি রুখে দাঁড়াও-তবেই তুমি বাংলাদেশ’ এবং রাষ্ট্র গঠনে—‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’


গণভবনে জনতার ঢল ও স্বাধীনতার আনন্দ


৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে কারফিউ ও ব্যারিকেড ভেঙে লাখ লাখ জনতা ঢাকায় প্রবেশ করেন। দুপুরে সেনাপ্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর শাহবাগ, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জাতীয় সংসদ ভবন জনতার দখলে চলে যায়। রাজপথে নফল নামাজ ও মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘকালের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির বিজয় উদযাপন করে।