ফিফা সভাপতির বিতর্কিত উদ্যোগের মুখে উয়েফার জোরালো প্রতিবাদ; লরা ও লিসোর সাহসিকতায় রক্ষা পেল বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ
ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপসহ ফুটবলের বড় বড় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব বা স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা আটকে গেল ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার (উয়েফা) তীব্র বাধার মুখে। আর এই ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেওয়ার নেপথ্যে সবচেয়ে জোরালো ও সাহসী ভূমিকা রেখেছেন উয়েফা কার্যনির্বাহী কমিটির একমাত্র দুই নারী সদস্য—লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার এবং লিসে ক্লাভেনেস।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এই তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।
জরুরি বৈঠক ও ফিফা বর্জনের চরম হুমকি
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইনফান্তিনোর এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মূল বিশ্বকাপসহ বড় প্রতিযোগিতাগুলোর ওপর সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—এমন গভীর আশঙ্কায় প্রায় ১৫০ জন উয়েফা কর্মকর্তাকে নিয়ে এক জরুরি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অধিকাংশ পুরুষ কর্মকর্তা ফিফার সাথে আলোচনা বা মধ্যস্থতার পথ খুঁজছিলেন। তবে ওয়েলসের প্রতিনিধি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার সরাসরি ফিফার এসব প্রতিযোগিতা বর্জনের মতো কঠোর প্রস্তাব তোলেন। তাঁর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে নরওয়ের লিসে ক্লাভেনেস প্রয়োজনে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা এবং বাণিজ্যিক স্বচ্ছতার স্বার্থে আরও কঠোর জবাবদিহির জোর দাবি জানান।
উয়েফার অভ্যন্তরে এই দুই নারী সদস্যের এমন নজিরবিহীন ও দৃঢ় অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত ব্যাকফুটে চলে যায় ফিফা এবং ইনফান্তিনোর সেই বিতর্কিত পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
লরা ও ক্লাভেনেস: ফুটবলের দুই প্রতিবাদী কণ্ঠ
লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার: ওয়েলসের সাবেক এই আন্তর্জাতিক ফুটবলার মাঠের খেলার পর থেকেই নারী ফুটবলের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রথম ওয়েলশ প্রতিনিধি হিসেবে উয়েফার কার্যনির্বাহী কমিটিতে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই পরবর্তীতে উয়েফা কমিটিতে নারীদের সংরক্ষিত আসন একটি থেকে বাড়িয়ে দুটি করা হয়।
লিসে ক্লাভেনেস: নরওয়ের হয়ে ৭৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ক্লাভেনেস পেশায় একজন আইনজীবী। ২০২২ সালে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের ১২০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে কাতার বিশ্বকাপের মানবাধিকার লঙ্ঘন, গাজা সংকেটে ফুটবলের ভূমিকা এবং ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বারবার আওয়াজ তুলেছেন তিনি।
| পরিচিতি | লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার | লিসে ক্লাভেনেস |
| দেশ | ওয়েলস | নরওয়ে |
| খেলোয়াড়ি জীবন | সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার | সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার (৭৩ ম্যাচ) |
| বর্তমান পদ | উয়েফা কার্যনির্বাহী কমিটি সদস্য | সভাপতি, নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন |
| মূল ভূমিকা | ফিফা প্রতিযোগিতা বর্জনের প্রস্তাব উত্থাপন | ফিফা নেতৃত্বে পরিবর্তন ও জবাবদিহির দাবি |
পুরুষশাসিত ফুটবল প্রশাসনে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অবস্থান এখনো বেশ সীমিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ সদস্যের মধ্যে নারী সদস্য মাত্র ৮ জন।
ফিফাভুক্ত ২১১টি দেশের মধ্যে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান বা সভাপতি পদে নারী আছেন মাত্র ১০ জন।
উয়েফার ২১ সদস্যের শক্তিশালী কার্যনির্বাহী কমিটিতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন মাত্র ২টি।
এমন এক পুরুষশাসিত প্রশাসনিক কাঠামোয় বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জিয়ানি ইনফান্তিনোর সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক পরিকল্পনা আটকে দিয়ে লরা ও ক্লাভেনেস ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।