১৩ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার, ১০:৪৮:৩০ অপরাহ্ন


সেই অবুঝ শিশু আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বী: মেসি ও ইয়ামালের ভাইরাল ছবির নেপথ্য গল্প
ক্রীড়া প্রতিবেদক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৭-১৬ ১৯:৫৩:৩৩
সেই অবুঝ শিশু আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বী: মেসি ও ইয়ামালের ভাইরাল ছবির নেপথ্য গল্প


আগামী ১৯ জুলাই ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে, যেখানে শিরোপা জয়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। তবে এই বৈশ্বিক ট্রফি জয়ের লড়াইকে ছাপিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন আলোচনা এখন ৩৯ বছর বয়সী জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসি এবং ১৯ বছর বয়সী স্প্যানিশ বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের দ্বৈরথ ঘিরে। বয়সের ব্যবধান ও অভিজ্ঞতায় দুজনের আকাশ-পাতাল তফাত থাকলেও, মাঠে দুজনের খেলার পজিশন, ধরণ এবং জাদুকরী বাঁ পায়ের জাদু এই ফাইনালকে এক অদ্ভুত নিয়তির মেলবন্ধনে রূপ দিয়েছে।

বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতা লিওনেল মেসির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন কাতালান ক্লাবটির বর্তমান সময়ের মূল কাণ্ডারি ও পোস্টারবয় লামিন ইয়ামাল। মাঠের লড়াইয়ে এটিই হতে যাচ্ছে তাঁদের ক্যারিয়ারের প্রথম পারস্পরিক দেখা। তবে বাস্তব জীবনে এই দুই তারকার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে। ইয়ামাল তখন নিতান্তই এক অবুঝ শিশু, আর মেসি ২০ বছরের এক উদীয়মান তরুণ তারকা। গত ২০২৪ সালের ইউরো কাপে যখন স্পেনের জার্সিতে ইয়ামালের রাজকীয় উত্থান ঘটছিল, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অবিশ্বাস্য ছবি ছড়িয়ে পড়ে। আসন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালের প্রেক্ষাপটে সেই স্মৃতিময় ছবিগুলো এখন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থবহ হয়ে উঠেছে।

ভাইরাল হওয়া প্রথম ছবিটিতে দেখা যায়, একটি সাধারণ প্লাস্টিকের বাথটাবে বসে আছে ছোট্ট ও নিষ্পাপ শিশু ইয়ামাল। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মা শেইলা ইবানা এবং কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলের ২০ বছর বয়সী লাজুক তরুণ মেসি হাত বাড়িয়ে সেই শিশুটিকে গোসল করাতে সাহায্য করছেন। ইয়ামালের বাবার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত ফুটবল সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানোর হাত ধরে ছবিটি মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে স্প্যানিশ দৈনিক ডিয়ারিও স্পোর্ট আরও একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় মেসি একা একা ছোট্ট ইয়ামালকে কোলে নিয়ে বাথটাবের পাশে অত্যন্ত লাজুক মুখে বসে আছেন।

২০০৭ সালে বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্প ন্যুর অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমে এই অবিস্মরণীয় ছবিগুলো তুলেছিলেন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট। এটি মূলত কাতালান সংবাদপত্র দিয়ারিও স্পোর্ট এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার তৈরির বিশেষ আয়োজন ছিল। পরবর্তীতে বার্তা সংস্থা এপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মনফোর্ট সেই পেছনের অজানা গল্প শুনিয়ে বলেন, ইউনিসেফ মাতারোর রকা ফান্ডা এলাকায় একটি লটারির আয়োজন করেছিল, যেখানে ইয়ামালের পরিবার বসবাস করত। ক্যাম্প ন্যু-তে বার্সেলোনার যেকোনো একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে ছবি তোলার দুর্লভ সুযোগ পেতেই তাঁরা লটারির টিকিট কেটেছিলেন এবং ভাগ্যবশত তাঁরা বিজয়ী হন।

তবে ছবি তোলার সেই ঐতিহাসিক শুটিংয়ের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। মনফোর্ট জানান, মেসি তখন অত্যন্ত অন্তর্মুখী ও ভীষণ লাজুক স্বভাবের ছিলেন। ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করে পানি ভর্তি প্লাস্টিকের বাথটাব এবং একটি শিশুকে দেখে তিনি বেশ ঘাবড়ে যান এবং কীভাবে তাঁকে কোলে নেবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে ইয়ামালের মা-ই এগিয়ে এসে মেসিকে অভয় দেন এবং ছবি তোলার কাজে সহায়তা করেন। এত বছর পর ড্রেসিংরুমের সেই ছোট্ট শিশু ও লাজুক তরুণ আজ বিশ্বমঞ্চের মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনালে একে অপরের বিপক্ষে লড়াই করবেন, যা ভাবতেই চরম রোমাঞ্চ বোধ করছেন আলোকচিত্রী মনফোর্ট।

সেদিনের পর থেকে সময়ের স্রোতে কেটে গেছে দীর্ঘ বছর। লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছেড়েছেন ক্লাব ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি'অর নিজের শোকেসে পুরে। অন্যদিকে, মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সার মূল দলে অভিষেক হওয়া ইয়ামাল ইতিমধ্যেই নিজের ঝুলিতে তিনটি লা লিগা এবং স্পেনের হয়ে ২০২৪ সালের ইউরো কাপের শিরোপা যোগ করেছেন। সদ্য ১৯ বছরে পা রাখা ইয়ামাল বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম দামি ও প্রভাবশালী তারকা। সম্প্রতি ক্রীড়াভিত্তিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘ডিএজেডএন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল মেসির মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি এখন কিছুটা বড় হয়েছেন এবং লিওর বয়সও বেড়েছে। যেহেতু ফিনালিসিমা ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়ায়নি, তাই এই ফাইনাল ম্যাচটি তাঁর জন্য মেসির মুখোমুখি হওয়ার দারুণ এক সুযোগ। অবশেষে নিয়তি তাঁদের আবার একই বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের একটি বড় অংশ ইয়ামালকে বার্সেলোনায় মেসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাবলেও, ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের উচ্চতায় পৌঁছাতে ইয়ামালকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে রোববারের স্বপ্নের ফাইনালে বাথটাবের সেই ছোট্ট শিশু নাকি চিরসবুজ জাদুকর মেসি শেষ হাসি হাসবেন, তা দেখতে এখন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।