১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৯:০১:২৬ অপরাহ্ন


এল নিনোর ছায়ায় তাপপ্রবাহ: দক্ষিণ এশিয়ার সামনে নতুন জলবায়ু সতর্কতা, ঝুঁকিতে বাংলাদেশও
সোহেল জুলফিকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৭-০৪ ১৮:৫৮:৪৮
এল নিনোর ছায়ায় তাপপ্রবাহ: দক্ষিণ এশিয়ার সামনে নতুন জলবায়ু সতর্কতা, ঝুঁকিতে বাংলাদেশও


প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জন্ম নেওয়া একটি আবহাওয়াগত পরিবর্তন এখন দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এই পরিবর্তনের নাম এল নিনো—যে পরিস্থিতিতে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থায়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা—ডব্লিউএমওর সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট সময়ের মধ্যে এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা ছিল ৮০ শতাংশ; আর অন্তত নভেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ বা তার বেশি। পরবর্তী আপডেটে সংস্থাটি জানায়, tropical Pacific অঞ্চলে এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে তা দ্রুত জোরালো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের NOAA Climate Prediction Center-ও ১১ জুনের বুলেটিনে জানিয়েছে, এল নিনো পরিস্থিতি বিদ্যমান এবং ২০২৬-২৭ উত্তর গোলার্ধের শীতকাল পর্যন্ত তা আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনো কোনো একটি দিনের তাপপ্রবাহের একক কারণ নয়। বরং এটি বৃহত্তর জলবায়ু ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রভাবিত করে, যাতে অনেক অঞ্চলে গরমের তীব্রতা, বৃষ্টির অনিয়ম, খরা-সদৃশ পরিস্থিতি এবং কখনও কখনও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার মতো বর্ষানির্ভর অঞ্চলে এই পরিবর্তনের প্রভাব তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন মৌসুমি বর্ষা। South Asian Climate Outlook Forum বা SASCOF-এর ২০২৬ সালের জুন–সেপ্টেম্বর মৌসুমি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বড় অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে দিনের সর্বোচ্চ ও রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। ডব্লিউএমও বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টির ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশই আসে জুন থেকে সেপ্টেম্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বর্ষা থেকে। এই বৃষ্টিই কৃষি, পানীয় জল, নদী-নালা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং সেচ ব্যবস্থার প্রধান ভরসা।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ—আতঙ্ক নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি। বর্ষা যদি দুর্বল বা অনিয়মিত হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আমন মৌসুমের ধান অনেকটাই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি দেরিতে এলে চারা রোপণ বিলম্বিত হতে পারে, আবার দীর্ঘ বিরতি বা তীব্র গরমে মাটির আর্দ্রতা কমে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সেচনির্ভর কৃষি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা পরিস্থিতিও নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।

কম বৃষ্টির আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে নদীর প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢোকার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, গরম দীর্ঘস্থায়ী হলে শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যায় এবং গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে চাল, সবজি, ডাল ও তেলবীজসহ নিত্যপণ্যের বাজারেও চাপ পড়তে পারে।

জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত গরমে হিট ক্র্যাম্প, হিট এক্সহস্টশন এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী, হৃদ্‌রোগী, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগী, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষক এবং দিনমজুরেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তাপজনিত চাপ হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং কিছু সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। হিটস্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা-অবস্থা—এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে জীবনঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে বর্ষা, উষ্ণতা ও আর্দ্রতার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগও জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত চলতি বছরে দেশে ৬ হাজার ৫৯৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং ১৯ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। তাই গরম, বর্ষা ও জনস্বাস্থ্য—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সাধারণ মানুষের করণীয়

তীব্র গরমের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরকে ঠান্ডা ও পানিশূন্যতামুক্ত রাখা। বাইরে কাজ করলে সঙ্গে নিরাপদ পানি রাখুন এবং বারবার অল্প অল্প করে পান করুন। ঘরে-বাইরে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতি পোশাক ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে দিনের সবচেয়ে গরম সময়—বিশেষ করে দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত—অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।

যারা বাইরে কাজ করেন, তারা একটানা কাজ না করে মাঝেমধ্যে ছায়ায় বিশ্রাম নিন। রোদে বের হলে ছাতা, টুপি, ক্যাপ বা কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়মিত খোঁজ নিন। ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং প্রয়োজন হলে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করুন বা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নিন। প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হলে বুঝতে হবে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—এ অবস্থায় পানি ও ওরস্যালাইন গ্রহণ করা জরুরি হতে পারে।

যা এড়িয়ে চলবেন

তীব্র রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান করবেন না। খালি পেটে রোদে বের হওয়া, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং দীর্ঘ সময় পানিহীন থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। খুব বেশি ঝাল, তেলযুক্ত, বাসি বা খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন। রাস্তার অনিরাপদ শরবত বা বরফ মেশানো পানীয় পান না করাই ভালো, কারণ এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকতে পারে। শিশু বা পোষা প্রাণীকে কখনও বন্ধ গাড়ির ভেতরে রেখে যাবেন না।

অতিরিক্ত চা-কফি, কোমল পানীয় বা বেশি চিনিযুক্ত পানীয় শরীরের পানির ভারসাম্যে সমস্যা করতে পারে। তাই এসব সীমিত রেখে নিরাপদ পানি, লেবুর শরবত, ওরস্যালাইন বা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর তরল খাবার গ্রহণ করা ভালো।

কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন

কারও শরীর অস্বাভাবিক গরম হয়ে গেলে, ঘাম বন্ধ হয়ে গেলে, মাথা ঘোরা, বমিভাব, তীব্র মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা প্রস্রাব কমে গেলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। স্বাস্থ্য-পরামর্শের জন্য সরকারি স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, এল নিনো বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের ঘোষণা নয়; তবে এটি একটি বড় জলবায়ুগত সতর্কবার্তা। আবহাওয়া বদলাচ্ছে, বর্ষা অনিশ্চিত হচ্ছে, গরম দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা, কৃষি পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য প্রস্তুতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সচেতনতাই হতে পারে এই তাপ-ঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।