১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৬:৪৬:৩৪ অপরাহ্ন


আমির খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম চলচ্চিত্র: ‘লগান’ সিনেমার ২৫ বছর ও কিছু অজানা গল্প
বিনোদন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | কুবলাই
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৬-২১ ১৩:৩০:৪৫
আমির খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম চলচ্চিত্র: ‘লগান’ সিনেমার ২৫ বছর ও কিছু অজানা গল্প


২০০১ সালের ১৫ জুন মুক্তি পেয়েছিল আশুতোষ গোয়াড়িকর পরিচালিত কালজয়ী বলিউড চলচ্চিত্র ‘লগান’। ক্রিকেট, দেশপ্রেম, প্রেম আর সংগ্রামের এক অনন্য মিশেলে নির্মিত এই ছবিটি আজ ২০২৬ সালে এসে মুক্তির ২৫ বছর পূর্ণ করেছে। সিনেমার শেষ দৃশ্যে চম্পানের দরিদ্র কৃষকেরা অসম্ভবকে সম্ভব করে ব্রিটিশদের হারিয়ে দিয়ে সিনেমা হলের দর্শকদের হাততালি ও শিসে ভাসিয়েছিল। তবে পর্দার সেই কাহিনীর ঠিক উল্টো এক বাস্তব ঘটনা ঘটেছিল ছবিটির শুটিং চলাকালে, যা অনেকেই জানেন না। শুটিংয়ের ফাঁকে একদিন ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিনেতাদের মধ্যে একটি আসল ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে সিনেমার গল্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনায়াসেই জয় তুলে নিয়েছিল ব্রিটিশ দল। ২০০০ সালের ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত এই ‘গ্রাজ ম্যাচে’ আমির খানের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলে ছিলেন ছবির অপেশাদার অভিনেতা ও কলাকুশলীরা এবং ব্রিটিশ দলে ছিলেন ছবিতে ইংরেজ চরিত্রে অভিনয় করা ক্লাব বা কাউন্টি পর্যায়ের দক্ষ ক্রিকেটার শিল্পীরা। ব্রিটিশদের দলে খেলোয়াড় কম থাকায় ভারতীয় দল থেকে ‘কাচরা’ খ্যাত অভিনেতা আদিত্য লখিয়াকে ধার দেওয়া হলে সহখেলোয়াড়েরা তাঁকে মজা করে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে ডাকতেন। সিনেমার অপেশাদার ক্রিকেটারদের বিপরীতে ব্রিটিশ অভিনেতারা নিয়মিত ক্রিকেট খেলার কারণে বাস্তবে চম্পানের স্বপ্ন ভেঙে সহজেই জয়ী হয় ব্রিটিশ দল, তবে হারলেও ভারতীয় দল ক্রীড়াসুলভ মনোভাব দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল।

বাস্তব মাঠের পরাজয় ও কঠোর নিয়মের শুটিং

‘লগান’ ছিল তৎকালীন সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল হিন্দি ছবিগুলোর একটি, যা প্রায় ২৫ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত এবং এটি ছিল আমির খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম চলচ্চিত্র। এই ছবিতে কার্যনির্বাহী প্রযোজক হিসেবে অভিষেক ঘটেছিল আমিরের তৎকালীন স্ত্রী রীনা দত্তের, যিনি কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় আদিত্য চোপড়া ও সুভাষ ঘাইয়ের মতো অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। ছবির পুরো শুটিং হয়েছিল গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলের মরুভূমিতে, কোনো বিরতি ছাড়া একটানা একটি শিডিউলে। কচ্ছের তীব্র গরমে শুটিং সহজ করতে কাল্পনিক চম্পান গ্রামের সেটটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়, যার প্রতিটি কুঁড়েঘরে বাইরে থেকে গ্রামীণ মনে হলেও ভেতরে এয়ারকন্ডিশনার ও টয়লেটের আধুনিক ব্যবস্থা ছিল। শুটিং সেটে আন্তর্জাতিক মানের খাবার ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য শুধু বোতলজাত পানি ব্যবহারের নির্দেশ ছিল, যা দিয়ে কেউ কেউ চুলও ধুতেন। ইউনিটের সময়ানুবর্তিতা এত কঠোর ছিল যে, শুটিংয়ের দ্বিতীয় দিন স্বয়ং তারকা অভিনেতা আমির খান মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি করায় ইউনিটের বাস তাঁকে রেখেই চলে গিয়েছিল। এছাড়া ছবিতে নিজের গ্রামীণ লুককে বাস্তবসম্মত করতে আমির তাঁর স্ত্রী রীনার কানের দুল পরেছিলেন, তবে দীর্ঘ খরাপীড়িত গ্রামের এক যুবকের ‘ক্লিন-শেভড লুক’ নিয়ে তাঁর মনে একটা বড় আফসোস রয়ে গেছে।

অস্কারের মঞ্চ এবং অজানা কিছু তথ্য

সিনেমাটির প্রথম কাট ছিল সাড়ে সাত ঘণ্টার, যা পরে দীর্ঘ সম্পাদনার মাধ্যমে ৩ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে নামানো হয়। ছবিতে বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ অভিনেতার অংশগ্রহণ সে সময় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছিল। ছবির জনপ্রিয় গান ‘চলে চলো’-র প্রাথমিক নাম ছিল ‘নাশা নাশা’, যা গীতিকার জাভেদ আখতারের আপত্তিতে পরিবর্তন করা হয় কারণ খরাপীড়িত গ্রামের মানুষ নেশা নিয়ে গান গাইবে তা বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। প্রায় তিন দশক পর এই বড় বলিউড প্রজেক্টেই প্রথম সরাসরি শুটিংয়ের সময় সংলাপ রেকর্ডের জন্য জার্মানি থেকে বিশেষ ক্যামেরা এনে ‘সিঙ্ক-সাউন্ড’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। শুধু ক্রিকেট নয়, সেটে ব্রিটিশ অভিনেতা ব্যারি হার্টের উদ্যোগে একটি টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টও হয়েছিল, যেখানে ১৬টি ভারত-ব্রিটিশ যৌথ ডাবলস দলের মধ্যে আদিত্য লাখিয়া ও ক্রিস ইংল্যান্ড জুটি আমির খান ও শার্লট জুটিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। দুঃখজনকভাবে, শুটিং শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর ২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ভুজসহ শুটিংয়ের পুরো এলাকাটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বক্স অফিসে ব্যাপক সফলতার পাশাপাশি ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ও ‘সালাম বম্বে!’-র পর এটি ভারতের তৃতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে ৭৪তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে (অস্কার) সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল।