বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে একটি আধা কিলোমিটার কাঁচা রাস্তায় রাতারাতি ইট-বালু বিছিয়ে চলাচলের উপযোগী করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক ভিটায় পৌঁছানোর সুবিধার্থে তড়িঘড়ি করে এই ব্যবস্থা করা হলেও, সফর শেষ হওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সেই সড়ক থেকে বিছানো সমস্ত ইট তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমান বৃষ্টিতে কাঁচা ওই সড়কে চলাচল করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা, যা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার কাঁচা সড়কটি পাকাকরণ বা কার্পেটিং করার জন্য গত অর্থবছরে এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। দরপত্র আহ্বানের পর গত বছরের আগস্ট মাসে ‘মেসার্স হক ট্রেডার্স’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যার মেয়াদ আগামী আগস্ট বা অক্টোবরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সড়কের সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে সাইট বুঝে দিতে বিলম্ব হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সড়ক পাকাকরণের মূল কাজ যথাসময়ে শুরু করেনি, সেখানে বর্তমানে কেবল প্যালাসাইডিংয়ের কাজ চলছে।
এরই মধ্যে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে আসেন। সেদিন তিনি বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম এবং চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে পৈতৃক ভিটা ‘জিয়াবাড়ি’ পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে কাঁচা রাস্তায় রাতারাতি ইট বিছানোর তোড়জোড় শুরু করে এলজিইডি। শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমানকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অতিরিক্ত আরও ১৫০ মিটার রাস্তা ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজসহ এই অস্থায়ী সোলিং প্রক্রিয়ায় মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে গাবতলী উপজেলা পরিষদ থেকে ইতিমধ্যে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাকি টাকা এখনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর সফর সম্পন্ন হওয়ার পরপরই দায়িত্বপ্রাপ্ত আতিকুর রহমান তাঁর শ্রমিক দিয়ে রাস্তা থেকে সমস্ত ইট তুলে পুনরায় ভাটায় নিয়ে যান। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনে কাঁচা সড়কে ইট বসায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছিল। কিন্তু এখন তড়িঘড়ি করে ইট তুলে নেওয়ায় এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করাই দায় হয়ে পড়েছে। ঠিকাদার আতিকুর রহমান জানান, এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি ভাটা থেকে ইট ভাড়া এনে শ্রমিক দিয়ে সড়কে বিছিয়েছিলেন এবং সফর শেষে তা ভাটায় ফেরত নিয়ে গেছেন। এর জন্য তিনি এলজিইডি থেকে শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ পেয়েছেন।
নিয়মনীতি মেনেই অস্থায়ীভাবে সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান। তিনি বলেন, ওই সড়ক পাকা করতে যেহেতু ৮৪ লাখ টাকা আগেই বরাদ্দ হয়েছে, তাই নতুন করে ইট কিনতে গেলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় অনেক বেড়ে যেত। খরচ বাঁচাতে অস্থায়ীভাবে সোলিং করার জন্য ইট মূলত ভাড়া নেওয়া হয়েছিল, যার কারণে সফর শেষে ঠিকাদারকে সেই ইট তুলে নিতে বলা হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক বলেন, একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে ইট বিছানো এবং তিনি চলে যাওয়ার পর তা তুলে নেওয়া এক ধরণের চরম ছলচাতুরী ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, যা এই কাজের সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।