১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ১০:০৩:৫৮ অপরাহ্ন


'তারা কুকুর লেলিয়ে দিত': ইসরায়েলি কারাগারে পদ্ধতিগত ধর্ষণের ভয়াবহ বিবরণ আল জাজিরার তথ্যচিত্রে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | সোহেল জুলফিকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৬-১০ ১৩:৫৯:৫৮
'তারা কুকুর লেলিয়ে দিত': ইসরায়েলি কারাগারে পদ্ধতিগত ধর্ষণের ভয়াবহ বিবরণ আল জাজিরার তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার মুহাম্মদ আল-বকরি। ছবি: আল জাজিরা


আল জাজিরার নতুন এক অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র 'বডিজ অফ এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কস্ট ওয়েপন'-এ ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর চালানো ভয়াবহ ও পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের লোমহর্ষক বিবরণ উঠে এসেছে। গাজার একজন সাধারণ সরকারি চাকরিজীবী মুহাম্মদ আল-বকরি তাঁর বন্দীজীবনের সেই অন্ধকার দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে জানান, ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন তাঁকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়। এক মাস আগে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এই ফিলিস্তিনিকে এর আগে তীব্র মারধর, নির্যাতন এবং নিজের পোশাকেই মলমূত্র ত্যাগ করতে বাধ্য করার মতো চরম অবমাননাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ঘটনার দিন এক ডজন ইসরায়েলি সেনা তাঁকে ঘিরে ধরে তাঁর নাম নিয়ে উপহাস করছিল। আল-বকরি জানান, তাঁর সঙ্গে থাকা আরও সাতজন বন্দীকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে, চোখ ও হাত বেঁধে অত্যন্ত বর্বর উপায়ে ধর্ষণ করা হয় এবং ইসরায়েলি রক্ষীরা হাসাহাসি করার পাশাপাশি সেই দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করে। এই পৈশাচিক নির্যাতনের সময় অফিসারদের নির্দেশে বন্দীদের ওপর হিংস্র পাহারাদার কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে এই পাশবিক নির্যাতন ও মারধরের পর তাঁদের পুনরায় সেলে ফিরিয়ে নেওয়া হতো।

আল জাজিরার এই তথ্যচিত্রে ছদ্মনামধারী মধ্যবয়সী ফিলিস্তিনি দিনমজুর 'জব'-এর গল্পও উঠে এসেছে, যিনি আল-বকরির মতোই নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রতিশোধের অংশ হিসেবে চোখ ও হাত বেঁধে জবের ওপর তীব্র শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়। বন্দীদের পেটের ওপর ভর দিয়ে শুইয়ে রেখে তাঁদের ওপর দিয়ে কুকুর হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো এবং পশুর মতো লাথি মারা হতো। ফিলিস্তিন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (পিসিএইচআর) এবং ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের মতো অধিকার গোষ্ঠীগুলোও বন্দীদের এমন বহু সাক্ষ্য নথিবদ্ধ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ইসরায়েলি সেনারা কীভাবে ফিলিস্তিনিদের ধর্ষণ করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করত।

জাতিসংঘ এবং শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ধর্ষণকে একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলকে জাতিসংঘের 'সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতাকারীদের কালো তালিকায়' অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এই কর্মকাণ্ডকে 'পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতন' বলে অভিহিত করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং তাদের আত্মসম্মানবোধ চূর্ণ করা। তবে এই ভয়াবহ অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনীর কোনো সেনা বা কারারক্ষীকে এখন পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। বরং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নেগেভ মরুভূমির 'সেদে তেইমান' আটক কেন্দ্রে এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে ধর্ষণের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পর আটক ১০ রক্ষীকে মুক্ত করতে ইসরায়েলের ডানপন্থী আইনপ্রণেতা ও বিক্ষোভকারীরা সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পরবর্তীতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ওই রক্ষীদের ওপর থেকে সব অভিযোগ তুলে নেয় এবং উল্টো যে নারী কর্মকর্তা (মেজর জেনারেল ইফাত তোমার-ইয়ারুশালমি) এই ধর্ষণের ভিডিও ফাঁসের সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ভিডিও প্রকাশ হওয়াকে দেশের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ জনসংযোগ (পিআর) হামলা বলে আখ্যায়িত করেন। এমনকি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে লিকুদ পার্টির সদস্য হানোখ মিলউইডস্কি প্রকাশ্য চিৎকারে দাবি করেন যে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ধর্ষণ করা সম্পূর্ণ বৈধ।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম বিমানবিকীকরণ (Dehumanization) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে "মানুষরূপী পশু" হিসেবে চিত্রিত করে এই গণহত্যা ও নির্যাতনকে ইসরায়েলি সমাজে জায়েজ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞরা, যেমন লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং আইসিসিতে গাজার ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনি দলের সদস্য ত্রিয়েস্তিনো মারিনিয়েলো জানান, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে বিচ্ছিন্ন যৌন সহিংসতা এবং বেসামরিক নাগরিকের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত প্যাটার্নের অংশ হিসেবে করা যৌন সহিংসতার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। যখন এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সুসংগঠিত এবং ব্যাপকভাবে চালানো হয়, তখন তা আর কেবল বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধ থাকে না, বরং তা সরাসরি 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' (Crimes against humanity) হিসেবে গণ্য হয়।