দেশের অটোমোবাইল শিল্পে এক ঐতিহাসিক ও পরিবেশবান্ধব বিপ্লবের সূচনা করে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নিজে চালিয়ে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার (২৩ মে) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রাঙ্গণে দেশীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর তৈরি বিভিন্ন ক্যাটাগরির বৈদ্যুতিক যানবাহন পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব যানবাহনের আধুনিক নির্মাণশৈলী ও কার্যক্ষমতা দেখে প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এই শিল্পের প্রসারে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় নীতিগত ও শুল্ক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তেজগাঁওয়ে ইভি শিল্পের প্রদর্শনী ও প্রধানমন্ত্রীর টেস্ট ড্রাইভ
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্যালয়ে পৌঁছালে তাঁর দপ্তরে প্রবেশের ঠিক আগে প্রাঙ্গণে সাজিয়ে রাখা গাড়িগুলো পরিদর্শন করেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সেখানে দুটি স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি), একটি কাভার্ড ভ্যান, একটি বাণিজ্যিক ট্রাক, একটি আধুনিক অটোরিকশা এবং দুটি স্টাইলিশ মোটরসাইকেল প্রদর্শন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহের সাথে গাড়িগুলোর প্রযুক্তিগত দিক পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রথমে একটি এসইউভি (SUV) কারে চালকের আসনে বসেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একজন বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি এ সময় তাঁর পাশে বসে গাড়িটির ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড, ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট এবং উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ব্রিফ করেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই গাড়িটি চালিয়ে কার্যালয় প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন এবং পরবর্তীতে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত একটি পরিবেশবান্ধব কাভার্ড ভ্যানও টেস্ট ড্রাইভ করেন।
এক চার্জে ৪৫০ কিলোমিটার: দেশীয় প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য চমক
গাড়ি পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এ মান্নান হোসেন খান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবিরকে সাথে নিয়ে নিজ দপ্তরে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন। বৈঠকে ইভি গাড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন, দেশের বাজারে এর বিপণন সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, বাংলাদেশ অটোরেজিস্ট্রেশনের অধীনে এটিই দেশের প্রথম সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং উদ্যোগ। এই গাড়িগুলো শতভাগ ব্যাটারিচালিত হওয়ায় এতে কোনো ফসিল ফুয়েল বা জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় না, যা দেশের কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সাথে সাধারণ তেলের গাড়ির তুলনায় এর বিদ্যুৎ খরচ অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং দেশের আপামর মধ্যবিত্তের বাজেটের কথা মাথায় রেখেই এর মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, এই এসইউভি গাড়িগুলো মাত্র একবার পূর্ণ চার্জে ৪৫০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে সক্ষম, যা সাধারণ চার্জারে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা এবং ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তিতে মাত্র ৩০ মিনিটে পূর্ণ হয়ে যায়। অন্যদিকে, কমার্শিয়াল ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানগুলো একবার চার্জে প্রায় ২০০ কিলোমিটার চলতে পারে।
শুল্ক সুবিধা ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এ মান্নান হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানান, গাড়িগুলো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে তৈরি হলেও কিছু অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই উদীয়মান শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য গাড়ির দাম আরও কমাতে যদি আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর বিশেষ শুল্ক সুবিধা (Tariff Benefit) দেওয়া হয়, তবে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে এই আন্তর্জাতিক মানের গাড়ি বাজারে ছাড়া সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির অত্যন্ত আশাবাদের সাথে জানান যে, গাড়িগুলো সম্পূর্ণ ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড ও নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি খুব শিগগিরই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ নিয়ে এই গাড়িগুলো ইউরোপসহ বিদেশের বাজারে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক মান ও সর্বোচ্চ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যদি পরিবেশবান্ধব যানবাহন উৎপাদন করা যায়, তবে দেশীয় শিল্পের স্বার্থে সরকার শুল্ক ছাড়সহ সব ধরনের ব্যাকআপ দেবে।
এই গৌরবময় ও প্রযুক্তিগত মাইলফলকের সাক্ষী হিসেবে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা।