১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৯:২৫:৩৭ অপরাহ্ন


আর্থিক অভাবের কারণে কোরবানি দিতে পারছেন না? মন খারাপ করবেন না!
অনলাইন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৫-২১ ২১:০৭:৫৬
আর্থিক অভাবের কারণে কোরবানি দিতে পারছেন না? মন খারাপ করবেন না!


পবিত্র জিলহজ মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদত, আত্মত্যাগ ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য ও বরকতময় অনুভূতির মৌসুম। ইসলামের বিধান অনুযায়ী সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব হলেও, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সমাজের অনেকের পক্ষেই পশু কোরবানি দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে কোনো মুমিন আল্লাহর অসীম রহমত ও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন—ইসলামের উদার নীতি এমনটি বলে না। বরং যারা খাঁটি নিয়ত থাকা সত্ত্বেও কোরবানি দিতে পারছেন না, তাদের জন্য শরিয়তে বিশেষ কিছু আমল ও সমপরিমাণ সওয়াব অর্জনের চমৎকার সুযোগ রাখা হয়েছে।
১. নখ-চুল না কাটার বিশেষ সুন্নাহ ও কোরবানি
যাদের কোরবানি দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য একটি বিশেষ সান্ত্বনাদায়ক ও বরকতময় আমলের কথা হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন, "তুমি ঈদের দিন তোমার চুল, নখ ও গোঁফ ছাঁটবে এবং নাভির নিচের অংশ পরিষ্কার করবে—আল্লাহর দরবারে এটিই তোমার কোরবানির মতো (সওয়াব) গণ্য হবে।" এই সুন্নাহর নিয়ম হলো, জিলহজের চাঁদ ওড়ার পর থেকে ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজের আগ পর্যন্ত নিজের নখ, চুল ও গোঁফ না কেটে রেখে দেওয়া এবং ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পর তা কাটা। বিশুদ্ধ হাদিসবেত্তাগণ এই আমল সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। [সূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ি: ৪৩৬৫]
২. অসচ্ছল উম্মতের জন্য নবীজি (স.)-এর কোরবানি
দরিদ্র ও অসচ্ছল উম্মতদের জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক ও আত্মিক সান্ত্বনা হলো, স্বয়ং বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (স.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই তাঁর অভাবী উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি করে গেছেন। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) কোরবানি জবাই করার পবিত্র মুহূর্তে বললেন, "আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ মহান। এই কোরবানিটি আমার এবং আমার উম্মতের মধ্যে যারা কোরবানি করতে সম্পূর্ণ অক্ষম—তাদের পক্ষ থেকে উৎসর্গ করা হলো।" [সূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ২৮১০; জামে তিরমিজি: ১৫২১]
জিলহজের প্রথম দশ দিনের সাধারণ আমল:
পশু কোরবানি দিতে না পারলেও জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের সাধারণ নফল ইবাদত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আল্লাহর কাছে বহুগুণ বেশি মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "এই দিনগুলোতে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই—এমনকি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়; তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া যে নিজের জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর পথে বেরিয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত কিছুই নিয়ে ফিরতে পারেনি (শহীদ হয়েছে)।" [সহিহ বুখারি: ৯৬৯]। তাই এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাসবিহ ($সুবহানাল্লাহ$), তাহমিদ ($আলহামদুলিল্লাহ$), তাহলিল ($লা\ ইলাহা\ ইল্লাল্লাহ$) ও তাকবির ($আল্লাহু\ আকবার$) পাঠ করা উচিত। এছাড়া ৯ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর উচ্চকণ্ঠে 'তাকবিরে তাশরিক' পড়া প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব।
আরাফার ঐতিহাসিক রোজা (৯ই জিলহজ)
কোরবানি দিতে না পারার দুঃখ ভুলে ৯ই জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনে একটি মাত্র নফল রোজা রাখার ফজিলত অত্যন্ত অতুলনীয়। প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (স.) এই রোজার গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, "আমি আল্লাহর কাছে জোরালো আশা রাখি যে, আরাফার দিনের এই একটি রোজা বান্দার বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের ছোট গুনাহের কাফফারা বা মোচনকারী হবে।" [সূত্র: সহিহ মুসলিম: ১১৬২]
নিয়তের অসামান্য সওয়াব ও কোরবানির মূল দর্শন
ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, "সব কাজের ফলাফল মানুষের নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" [সহিহ বুখারি: ১]। কোনো মুমিনের মনে যদি তীব্র ও আন্তরিক ইচ্ছা থাকে যে সামর্থ্য থাকলে সে অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় পশু কোরবানি দিত, তবে তার এই সৎ ও ব্যাকুল নিয়তের কারণেই পরম দয়ালু আল্লাহ তাকে কোরবানির পূর্ণ সওয়াব দান করতে পারেন।
অনেকে মনে করেন কোরবানি না দিতে পারলে ঋণ বা ধার করে হলেও পশু কিনতে হবে, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইসলামে যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তার জন্য ঋণগ্রস্ত হয়ে কোরবানি দেওয়া মোটেও আবশ্যক নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনেই স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি কারও ওপর তার সামর্থ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব বা বোঝা চাপিয়ে দেন না। পবিত্র কোরআনের সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এর মূল দর্শন তুলে ধরে বলেছেন:
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
"আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং তোমাদের অন্তরের তাকওয়া বা খোদাভীতিই তাঁর কাছে পৌঁছায়।"
সুতরাং, আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে যারা পশু জবাই করতে পারছেন না, তারা জিকির, রোজা, তাকবির ও সুন্নাহসম্মত নিখুঁত আমলের মাধ্যমে এই মোবারক মাসের পূর্ণ সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।