১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৮:০৭:৪৮ অপরাহ্ন


ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের ২৪-২৬ জেলা মরুভূমি হওয়ার পথে : পানিসম্পদমন্ত্রী
অনলাইন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৫-২৩ ১৮:২৫:৩২
ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের ২৪-২৬ জেলা মরুভূমি হওয়ার পথে : পানিসম্পদমন্ত্রী পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। ছবি : সংগৃহীত


ভারত কর্তৃক নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ২৪ থেকে ২৬টি জেলা এবং বিশাল এক জনসমষ্টি—প্রায় ৭ কোটি মানুষ মরুভূমির মতো চরম ও দুঃসহ সংকটের মুখে পড়েছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই সংকটের কারণে দেশের পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবন আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন।

শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জাতীয় নদী দিবস’ উপলক্ষে নোঙর ট্রাস্ট আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

ফারাক্কা ও পানির হিস্যা: বাংলাদেশের গভীর উদ্বেগ

পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি তাঁর বক্তব্যে ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশের ওপর পড়া ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের প্রায় ২৪ থেকে ২৬টি জেলা এবং ৭ কোটি মানুষ মরুভূমির মতো চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এটি কেবল একটি পানির সংকট নয়, এটি একটি পরিবেশগত বিপর্যয় যা দেশের কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।”

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ধুধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে, নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের এক তৃতীয়াংশের বেশি জনগণ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতার সম্মুখীন হচ্ছে বলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। মন্ত্রীর এই বক্তব্য সেই উদ্বেগেরই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তি ও পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ

ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান পানির হিস্যা ও গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান যে, সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী পানির প্রবাহ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী প্রতি ১০ দিন পর পর পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উজানে ও ভাটিতে পানির পরিমাপের ভারসাম্য বজায় রাখতে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) ও কারিগরি দল নিয়মিত কাজ করছে।”

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য জানিয়ে বলেন, “গত পরশু দিনও বাংলাদেশের একটি বিশেষজ্ঞ দল ভারতের কলকাতায় গিয়ে ফারাক্কা ব্যারেজ সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেছে। এই কারিগরি দলের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”

সংকট মোকাবিলায় সরকারের মহাপরিকল্পনা: পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ

ফারাক্কা এবং অন্যান্য উজানের নদীর সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে বর্তমান সরকার দেশের ভেতরে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জোর দিচ্ছে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ জোর দিয়েছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ সমাপ্ত করার লক্ষে কাজ করছে।

তিস্তা ব্যারেজ ও মহাপরিকল্পনা:

তিস্তা ব্যারেজ ও মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “তিস্তা পাড়ের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের অধিকার। বিগত তিন মাস মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, এই প্রকল্প নিয়ে যে প্রকৃত কাজ হওয়া দরকার ছিল, তা এখনো সমাপ্ত হয়নি। তাই আমাদের সম্পূর্ণ নতুনভাবে এবং গুরুত্বের সাথে কাজ শুরু করতে হয়েছে।”

তিনি তিস্তা অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেন। মন্ত্রী জানান যে, মন্ত্রণালয়ের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষজ্ঞ সহযোগী সংস্থা—আইডব্লিউএম (ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার মডেলিং), সিইজিআইএস (সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস) এবং ওয়ারপো (ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন)—গত তিন মাস ধরে তিস্তা অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, “বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিস্তা পাড়ের পাঁচ জেলার মানুষের উন্নয়নই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।”

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প:

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এর অতীত এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, “২০০২ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পদ্মা ব্যারেজের প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় এটি স্থবির থাকার পর বর্তমান সরকার নতুন করে এর যাত্রা শুরু করেছে।”

শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি আশ্বাস দিয়ে বলেন, “কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ দলের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রকল্প, তাই প্রতিটি পদক্ষেপ বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।”

রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরির অপচেষ্টা

বক্তব্যের একপর্যায়ে মন্ত্রী দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, একটি বিশেষ মহল এই আইনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং সরকারকে চাপে ফেলতে প্রতিনিয়ত মব বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এটি কোনোভাবেই সহযোগিতা হতে পারে না।”

বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, “দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর দেশ পুনর্গঠনে মাত্র তিন মাস সময় পর্যাপ্ত নয়। এই দুঃসময়ে সরকারকে সহযোগিতা না করে বিভিন্ন অশালীন বক্তব্য ও অপপ্রচার চালানো জাতি প্রত্যাশা করে না।”

গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ও সহযোগিতার আহ্বান

মন্ত্রী রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলা ও শালীনতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “রাজনীতিতে শৃঙ্খলা ও শালীনতা থাকা জরুরি। কথায় কথায় রাস্তা ব্লক বা অগণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে কোনো ভুলত্রুটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।”

তিনি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এবং দেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে সাংবাদিকসহ দেশের সচেতন সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারকে সহযোগিতা করার উদাত্ত আহ্বান জানান।

আলোচনা সভায় নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যারা দেশের নদীগুলোর সুরক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানান।