১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৫:৩৯:৪৯ অপরাহ্ন


সালিসে সম্ভ্রমের মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা! তীব্র অপমানে কিশোরীর আত্মহত্যার চেষ্টা!
নরসিংদী প্রতিনিধি | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৫-২৩ ১৭:৪৮:৩১
সালিসে সম্ভ্রমের মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা! তীব্র অপমানে কিশোরীর আত্মহত্যার চেষ্টা! সালিশ বৈঠকে উপস্থিত বিএনপি নেতা ও স্থানীয়রা।


নরসিংদীর সদর উপজেলায় এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণের ক্রমাগত ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর, স্থানীয় এক সালিস বৈঠকে সেই সম্ভ্রমহানির মূল্য মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে মীমাংসার কুপ্রস্তাব দেওয়ায় তীব্র অপমানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী। গতকাল শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে ঘরের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে অচেতন উদ্ধার করেন পরিবারের সদস্যরা। বর্তমানে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনযুদ্ধ চালাচ্ছে ওই কিশোরী।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শিবপুর উপজেলার এক টাইলস ফিটিংস ঠিকাদারের সাথে মাত্র এক মাস আগে বিয়ে হয়েছিল ওই কিশোরীর। তবে বিয়ের আগে থেকেই নাইম (২৫) নামের এক তরুণের সাথে তার এক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। নাইমের পরিবার এই বিয়েতে অসম্মতি জানানোয় কিশোরীর পরিবার তাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়। কিন্তু বিয়ের পরও নাইম তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং তাকে ফুসলিয়ে সংসার ছেড়ে চলে আসার জন্য চাপ দিতে থাকেন। নাইমের ভালোবাসার ওপর বিশ্বাস রেখে গত ১০ মে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে আসে মেয়েটি, যার ফলশ্রুতিতে তার পূর্বের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর নাইম তাকে বিয়ে করার নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের হেফাজতে নেয় এবং একটি বন্ধুর সহায়তায় আত্মগোপনে রেখে কয়েক দফায় তাকে ধর্ষণ করে।

কিন্তু ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর যখন কিশোরীর পরিবার নাইমকে দ্রুত বিয়ে করার জন্য চাপ দেয়, তখন নাইম সম্পূর্ণ বেঁকে বসে এবং তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। উপায়ান্তর না দেখে ভুক্তভোগী পরিবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনৈতিক নেতাদের শরণাপন্ন হয়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় স্তরে বিষয়টি সমাধানের জন্য একটি সালিস বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল হক টিটু, ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা এবং বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনসহ এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সালিসকারীরা বিয়ের পক্ষে মত দিলেও, ছেলেপক্ষের লোকজন মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে পুরো অপরাধটি ধামাচাপা দেওয়ার প্রস্তাব তোলে। নিজের জীবনের এত বড় সর্বনাশ ও সম্ভ্রমকে মাত্র কয়েক হাজার টাকায় পরিমাপ করার এই সামাজিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে পারেনি ওই কিশোরী। সালিস চলাকালীনই সে চরম অপমান বুকে নিয়ে বৈঠক ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে গলায় ফাঁস দেয়।

ঘটনার পরপরই অচেতন অবস্থায় তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ফরিদা গুলশানারা কবির তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি দেখে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। কিন্তু সেখানে কোনো আইসিইউ বেড খালি না থাকায় পরবর্তীতে তাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ বিষয়ে সালিসে উপস্থিত বিএনপি নেতা আওলাদ হোসেন মোল্লা জানান, তাঁরা সালিসকারীরা বিয়ের পক্ষেই ছিলেন, কিন্তু ছেলেপক্ষ টাকার প্রস্তাব তোলার মাঝেই সালিস শেষ হওয়ার আগে মেয়েটি এই চরম সিদ্ধান্ত নেয়। নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম আর আল মামুন জানান, ধর্ষণের প্রলোভন ও আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাটি তারা মৌখিকভাবে জেনেছেন, তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। লিখিত অভিযোগ পেলেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।