১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ১১:৫১:৫৫ অপরাহ্ন


গণতন্ত্রের অলিন্দে ‘অ্যালগরিদমিক’ উচ্ছেদ: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ মানুষের অন্তর্ধান
বিশেষ প্রতিবেদন | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | জুলফিকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৪-২৩ ২০:৩৫:৩১
গণতন্ত্রের অলিন্দে ‘অ্যালগরিদমিক’ উচ্ছেদ: পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ মানুষের অন্তর্ধান


ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে চলমান বিধানসভা নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝে এক ভয়াবহ ও অভূতপূর্ব প্রশাসনিক সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ভুক্তভোগীদের দাবি অনুসারে, রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে রহস্যজনকভাবে এবং পদ্ধতিগত উপায়ে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত এই ‘শুদ্ধি অভিযান’ আজ পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষের নাগরিক অস্তিত্বকে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।


১. ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’: নথির পাহাড় বনাম নাগরিকত্ব

চলতি বছরের শুরুতে ভারতের নির্বাচন কমিশন ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনী’ বা Special Intensive Revision প্রক্রিয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকায় থাকা ত্রুটি দূর করা। কিন্তু বাস্তবে এটি প্রান্তিক মানুষের জন্য এক আমলাতান্ত্রিক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষের এক উচ্চশিক্ষিত যুবক, যিনি বর্তমানে ম্যানচেস্টারে গবেষণারত, তাঁর অভিজ্ঞতা এই সংকটের গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। স্বাধীনতার আগের জমির দলিল, বাবার পাসপোর্ট এবং নিজের বৈধ নথিপত্র ভিডিও কলের মাধ্যমে বিডিও অফিসে জমা দিয়েও তিনি রেহাই পাননি। তাঁর পরিবারের চারজন সদস্যের নামই তালিকা থেকে উধাও হয়ে গেছে। অর্থাৎ, নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ‘যৌক্তিক অসংগতি’র অজুহাতে তাঁরা আজ ভোটার অধিকারহীন।


২. তিন ধাপের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া: পরিসংখ্যানের খেলা

‘সবার ইনস্টিটিউট’ নামক একটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নাম বাতিলের এই বিশাল কর্মকাণ্ডটি সম্পন্ন হয়েছে তিনটি সুপরিকল্পিত ধাপে:

  • প্রথম ধাপ (ডিসেম্বর): খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় প্রায় ৫৮ লাখ নাম বাতিল।

  • দ্বিতীয় ধাপ (ফেব্রুয়ারি): প্রথম চূড়ান্ত তালিকায় আরও ৫ লাখ নাম উধাও।

  • তৃতীয় ধাপ (মার্চ-এপ্রিল): ‘যৌক্তিক অসংগতি’র দোহাই দিয়ে শেষ মুহূর্তে আরও ২৭ লাখ নাম মুছে ফেলা।

গবেষকদের মতে, মৃত ব্যক্তি (২৪ লাখ) বা স্থানান্তরিত মানুষদের (২০ লাখ) হিসাব বাদ দিলেও প্রায় ৪৫-৫০ লাখ জীবিত ও যোগ্য ভোটারের নাম অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।


৩. ‘যৌক্তিক অসংগতি’ ও এআই-এর অপশাসন

তালিকায় নাম কাটার জন্য এবার একটি নতুন পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে— ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যানসি’ বা যৌক্তিক অসংগতি। এর আওতায় যেসব অদ্ভুত কারণে নাম কাটা হয়েছে:

  • মা-বাবার নামের বানানে সামান্য অমিল।

  • বাবা/মায়ের সাথে সন্তানের বয়সের ব্যবধান অস্বাভাবিক কম হওয়া।

  • একটি পরিবারে ছয়টির বেশি সন্তান থাকা।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিপূর্বেই অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচন কমিশন মানবিক বিচারবুদ্ধির তোয়াক্কা না করে অন্ধভাবে এআই টুল ব্যবহার করছে। ডিজিটাল এই প্রক্রিয়ায় কোনো দায়বদ্ধতা নেই। একজন সরকারি কর্মকর্তা ভুল করলে তাঁকে প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু একটি ‘অদৃশ্য অ্যালগরিদম’ যখন কারও নাম কাটে, তখন তার বিরুদ্ধে আপিল করার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যায়।


৪. লক্ষ্যবস্তু যখন প্রান্তিক সমাজ: মুসলিম, দলিত ও আদিবাসী

পরিসংখ্যান বলছে, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত।

  • বাদ পড়া ভোটারদের ৬০-৬৫ শতাংশই মুসলিম। * মুসলিমদের সঙ্গে দলিত, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠী যোগ করলে এই হার দাঁড়ায় ৯০ শতাংশে।

গলেহারা বেগমের মতো ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা, যাঁর কাছে ভোটার কার্ড ও আধার ছাড়া কোনো জমির দলিল নেই, তাঁকে আজ ‘সন্দেহভাজন’ নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অথচ তাঁর পরিবার এই দেশ বা রাজ্যভাগের আগে থেকেই এই মাটির সন্তান। আধুনিক আমলাতন্ত্রের ‘কাগজ নির্ভরতা’ আজ শিকড়হীন করে দিচ্ছে বাংলার প্রকৃত ভূমিপুত্রদের।


৫. রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নাগরিকত্বের অস্ত্র

এই পরিস্থিতির পেছনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ছায়া দেখছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলার মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে তকমা দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, এই ভোটার তালিকা সংশোধন যেন তারই এক প্রশাসনিক রূপ।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিজেপি যাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই মতুয়া সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষের নামও এবার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (CAA) এবং প্রস্তাবিত এনআরসি (NRC) মূলত একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অস্তিত্বের হুমকিতে ফেলার অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে।


উপসংহার: গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

ভারতের নির্বাচন কমিশন সাংবিনিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও, তাদের বর্তমান পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা থাকলেও, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তাঁদেরই সবার আগে সমাজ থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে।

পূর্ব বর্ধমানের গলেহারা বেগম কিংবা ম্যানচেস্টারের সেই গবেষক যুবক—তাঁরা আজ স্রেফ পরিসংখ্যান নন, তাঁরা ভারতের গণতন্ত্রের এক সংকটাপন্ন অবস্থার প্রতিচ্ছবি। কাগজ আর দলিলের ওপর ভিত্তি করে যখন নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয়, আর রক্তপাতহীনভাবে লাখ লাখ মানুষকে অধিকারচ্যুত করা হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।