২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছিল, তা হলো—জাতীয় সংসদের টানা তিনবারের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায়? দীর্ঘ ১৭ মাস লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর অবশেষে সোমবার (৬ এপ্রিল, ২০২৬) দিবাগত শেষ রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে আটকের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ রহস্যের অবসান ঘটেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, সেদিন দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবন থেকে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে বের হয়ে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রোটোকল ভেঙে সরকারি বিলাসবহুল গাড়ির বদলে তিনি সপরিবারে একটি সাধারণ প্রাইভেট কারে চড়ে অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর থেকে তার অবস্থান নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি। জনমনে প্রশ্ন ওঠে, তিনি কি সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে চলে গেছেন নাকি দেশের ভেতরেই কোথাও আত্মগোপন করে আছেন।
এই দীর্ঘ আত্মগোপনকালীন সময়ে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও ছিল নানা বিতর্ক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় এক মাস পর ২ সেপ্টেম্বর তিনি স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে সেই পদত্যাগপত্রটি তিনি কোথা থেকে এবং কীভাবে পাঠিয়েছিলেন, তা নিয়ে সে সময় ব্যাপক রহস্য তৈরি হয়। এদিকে, ক্ষমতার পালাবদলের পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রংপুরে স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন নিহতের ঘটনায় ২৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মূলত আইনি জটিলতা এবং গ্রেফতার এড়াতেই তিনি দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে আসেননি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবশেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ অভিযানে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। যদিও এই বাসাটি তার নিজের বলে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে, তবে তার স্বজনদের দাবি এটি তার এক আত্মীয়ের বাসভবন। ডিবি সূত্রের দাবি, দীর্ঘ ১৭ মাসের এই অন্তর্ধানে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপন করেছিলেন এবং সর্বশেষ কয়েক দিন ধরে ধানমন্ডির এই বাসাটিতে অবস্থান করছিলেন।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে টানা দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিকের এভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়া এবং পরিশেষে আটকের ঘটনাটি দেশের রাজনীতিতে এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বর্তমানে তাকে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।