১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৬:৩৭:৪৮ অপরাহ্ন


স্বৈরশাসন নাকি গণতন্ত্র? ট্রাম্পের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র ‘নো কিংস মুভমেন্ট’!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | সোহেল জুলফিকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৩-২৯ ২০:০০:৩৪
স্বৈরশাসন নাকি গণতন্ত্র? ট্রাম্পের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্র ‘নো কিংস মুভমেন্ট’! প্রতীকী ছবি। ছবি সৌজন্যে: X


আমেরিকার রাজপথে বর্তমানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটি শক্তিশালী স্লোগান— ‘নো কিংস’ (No Kings)। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনপদ্ধতি এবং তাঁর নীতিমালার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই নাগরিক আন্দোলন এখন দেশটির রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। লাখো মানুষের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।


১. ‘নো কিংস মুভমেন্ট’ কী?

সহজ কথায়, এটি আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের বিরুদ্ধে একটি বিশাল নাগরিক প্রতিবাদ। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ এক চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন আমেরিকার হাজারো ছোট-বড় শহরে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

স্লোগানটির তাৎপর্য: ‘নো কিংস’ স্লোগানটি আমেরিকার প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের দিকে আঙুল নির্দেশ করে। এর মূল বার্তা হলো— আমেরিকায় কোনো ‘রাজা’ নেই; আইন সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত নয়, বরং তা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।

২. কেন এই আন্দোলন? (আন্দোলনের পেছনের কারণ)

বিক্ষোভকারীদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করছেন। আন্দোলনকারীরা প্রধানত চারটি বিষয়ে ক্ষুব্ধ:

ক্ষমতার অপব্যবহার: প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

স্বৈরশাসনভীতি: ট্রাম্পের শাসনপদ্ধতিকে অনেকেই নিপীড়নকারী রাজতন্ত্রের সাথে তুলনা করছেন।

অমীমাংসিত যুদ্ধ: ইরান ও গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংশ্লিষ্টতা এবং যুদ্ধের বিরোধিতা।

নাগরিক অধিকার: গর্ভপাতের অধিকার খর্ব হওয়া এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো অভ্যন্তরীণ সংকট।

৩. আন্দোলনের কাঠামো: নেতা কে?

এই আন্দোলনের কোনো একক নেতা বা কেন্দ্রীয় কমান্ড নেই। এটি একটি ‘জোটভিত্তিক মডেল’ (Coalition Model), যেখানে বিভিন্ন সংগঠন একসঙ্গে কাজ করছে:

ইনডিভাইজিবল (Indivisible)

ফাইভজিরোফাইভজিরোওয়ান (50501) মুভমেন্ট

জলবায়ু ও নাগরিক অধিকার ভিত্তিক সংগঠনসমূহ

সুবিধা: কোনো নির্দিষ্ট নেতা না থাকায় আন্দোলন দমন করা কঠিন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সহজ হয়।

অসুবিধা: সরকারের সাথে আলোচনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রতিনিধি নেই, যা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।

৪. ৫টি বড় চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

আন্দোলনটি বড় হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে:

দাবির অস্পষ্টতা: একেক অঞ্চলে একেক দাবি (কোথাও যুদ্ধ বন্ধ, কোথাও দ্রব্যমূল্য) থাকায় নীতিনির্ধারকদের জন্য এই আন্দোলন এড়িয়ে যাওয়া সহজ হচ্ছে।

নেতৃত্বের সংকট: আলোচনার জন্য কোনো স্বীকৃত মুখ নেই, যা আন্দোলনকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে বাধা দিচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন: জোটে থাকা প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থীদের মধ্যে বৈদেশিক নীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

নতুন ভোটার টানার সীমাবদ্ধতা: অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই আগে থেকে অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত। সাধারণ নিরপেক্ষ মানুষকে কতটা উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

রাজনৈতিক প্রভাব: রাস্তায় লাখো মানুষ নামলেও তা কি নির্বাচনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমাতে পারবে? ইতিহাস বলে, সব বড় বিক্ষোভই ভোটের ফল বদলে দেয় না।

৫. সরকারের প্রতিক্রিয়া

হোয়াইট হাউস এই আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই বিক্ষোভকারীরা আমেরিকার সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। সরকার এই আন্দোলনকে দমনের চেয়ে বরং ‘উপেক্ষা করার’ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে।

৬. ভবিষ্যৎ কী?

নো কিংস আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখন দুটি বিপরীত দিকে যেতে পারে:

সম্ভাবনাফলাফল
উত্তেজনা বৃদ্ধিবিক্ষোভ বাড়লে সংঘাত হতে পারে, যা রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করবে।
আন্দোলনে ক্লান্তিসুনির্দিষ্ট কোনো অর্জন বা নীতিগত পরিবর্তন না এলে মানুষ উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে এবং গণমাধ্যমের মনোযোগ কমে যাবে।

‘নো কিংস’ মুভমেন্ট দেখাচ্ছে যে ২১শ শতকের আন্দোলনগুলো আর আগের মতো নয়। এটি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক স্বতঃস্ফূর্ত জনবিস্ফোরণ। এটি হয়তো রাতারাতি আইন বদলাতে পারবে না, কিন্তু আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল জনশক্তি কি আগামী নির্বাচনে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, নাকি এটি কেবল ইতিহাসের পাতায় একটি ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ হিসেবেই থেকে যাবে।