মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে স্নায়ুর বিদ্যুৎ-তরঙ্গের যে জটিল খেলা চলে, তা দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে এক গভীর রহস্য ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, এআই এখন মানুষের মনের ভেতরের কথা বা যাকে আমরা "অন্তর্নিহিত ভাষা" বলি, তা আংশিকভাবে পড়ে ফেলতে পারছে। বিশেষ করে যারা পক্ষাঘাতের কারণে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের জন্য এই প্রযুক্তি এক নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় ৫২ বছর বয়সী এক নারী অংশ নেন, যিনি প্রায় ১৯ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা তার মস্তিষ্কের সামনের অংশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোডের একটি সেট বসিয়ে দেন। তিনি যখন মনে মনে কোনো শব্দ উচ্চারণ করার কথা কল্পনা করছিলেন, তখন কম্পিউটারভিত্তিক এআই সিস্টেম সেই স্নায়ু-সংকেতগুলো বিশ্লেষণ করে সরাসরি পর্দার ওপর বাক্য হিসেবে ফুটিয়ে তুলছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, এআই এখন মানুষের চিন্তাকে রিয়েল-টাইমে টেক্সটে রূপান্তর করতে সক্ষম হচ্ছে। একই সময়ে জাপানের গবেষকরাও "মাইন্ড ক্যাপশনিং" নামক একটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছেন, যা মস্তিষ্কের স্ক্যান ব্যবহার করে মানুষ কী দেখছে বা কল্পনা করছে তার বিস্তারিত বর্ণনা তৈরি করতে পারে।
মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনকারী এই প্রযুক্তি, যা ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ নামে পরিচিত, তা আসলে খুব একটা নতুন নয়। ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানী এবারহার্ড ফেটজ দেখিয়েছিলেন যে একটি বানর তার নিউরনের কার্যকলাপ দিয়ে মিটার নাড়াতে পারে। কিন্তু মানুষের ভাষা বা জটিল চিন্তা ডিকোড করা ছিল অনেক বেশি কঠিন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই এবং মেশিন লার্নিংয়ের অভাবনীয় উন্নতির ফলে এই কাজে দারুণ গতি এসেছে। গবেষক ফ্রাঙ্ক উইলেট্টের নেতৃত্বাধীন দলটি লক্ষ্য করেছেন যে, মানুষ যখন মনে মনে কোনো বাক্য গঠন করে বা গণনা করে, তখনও মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্সে নির্দিষ্ট স্নায়ু-সংকেত তৈরি হয়। কল্পিত বাক্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রায় ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত সঠিক ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ সালের দিকে এএলএস আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, তাদের চিন্তাকে টেক্সটে রূপান্তর করার নির্ভুলতা প্রায় ৯৭.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, এআই এখন মানুষের গলার স্বরের ওঠানামা, কথার গতি এবং আবেগও আংশিকভাবে পুনর্গঠন করতে পারছে।
এই প্রযুক্তির প্রভাব শুধু কথা বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেখা এবং শোনার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও এটি কাজ করছে। জাপানের নাগোয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ইউ তাকাগি দেখিয়েছেন যে, এফএমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে মানুষ যে ছবি দেখছে তার অনুরূপ ছবি এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ‘স্ট্যাবল ডিফিউশন’-এর মতো ইমেজ জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ চিত্রের রং, বিন্যাস এবং অর্থ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে, যা এআই নিখুঁতভাবে ধরতে পারে। এমনকি সংগীত শোনার সময় মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া থেকে সেই সুরটি কেমন ছিল তাও পুনর্গঠন করার চেষ্টা চলছে।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক ব্রেন-চিপ বাজারে আনার জন্য কাজ করছে। গবেষকদের আশা, এই প্রযুক্তি কেবল রোগীদের যোগাযোগের মাধ্যমই হবে না, বরং এটি মানুষের স্বপ্ন পুনর্গঠন করা, মানসিক রোগীদের মনের অবস্থা বোঝা কিংবা এক মস্তিষ্ক থেকে অন্য মস্তিষ্কে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের পথও তৈরি করতে পারে। তবে এর সাথে নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বড় প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মানুষের মনের গহীন জগত পুরোপুরি উন্মোচন করতে হয়তো আরও ১০ থেকে ২০ বছর সময় লাগবে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, এআই এখন আমাদের বলা কথার পাশাপাশি না-বলা কথাগুলোও বুঝতে শিখছে।