একটি ঐতিহাসিক জার্সি, একটি অমর নম্বর ৭ এবং তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বিশ্ব ফুটবলের অজস্র সোনালী ইতিহাস—সব স্মৃতির পাতায় এবার চিরতরে পড়ল এক রূপকথার সমাপ্তির রেখা। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন।
পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ৭ নম্বর জার্সি গায়ে আর কখনো মাঠে দেখা যাবে না সিআর সেভেনকে (CR7)। আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন বিবৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের এই ঘোষণা দেন ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত বিদায় ঘোষণা বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনকে এক প্রকার স্তব্ধ ও নড়েচড়ে বসিয়ে দিয়েছে।
পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ১৪৬টি গোল, আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার ও সর্বোচ্চ গোলদাতার বিশ্বরেকর্ড, ঐতিহাসিক ইউরো কাপ জয় এবং দুটি উয়েফা নেশনস লিগ—জাতীয় দলের প্রায় প্রতিটি ঐতিহাসিক অর্জনেই নিজের সোনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন রোনালদো। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কোচ রবার্তো মার্তিনেজের সঙ্গে নানা গুঞ্জন, স্কোয়াড নিয়ে মনোমালিন্য এবং জাতীয় দলের ক্যাম্প ঘিরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বিতর্ক ও আলোচনার মাঝেই তাঁর এই হঠাৎ বিদায়ের ঘোষণা ভক্তদের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
৭ নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে জাতীয় দলের হয়ে একটানা ২৩ বছর ধরে যে পবিত্র জার্সিটি গায়ে জড়িয়ে বিশ্বজয় করেছিলেন, এবার সেই ইতিহাসমণ্ডিত জার্সিটি নতুন প্রজন্মের উদীয়মানদের হাতে তুলে দিতে চান রোনালদো।
অবসরের ঘোষণায় অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বলেন, “জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসে গেছে। কখনোই মনে করিনি, জার্সিটি শুধু আমার একার ছিল। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, এর প্রতিনিধিত্ব করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে এটি গায়ে নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ ও গুরুদায়িত্ব পেয়েছি আমি।”
নিজের এই সিদ্ধান্ত যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল, তা স্বীকার করে তিনি আরও যোগ করেন, “আজ সময় এসেছে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কারণ, জীবনের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নয়, বরং হৃদয় দিয়ে নিতে হয়।”
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে শুরু হওয়া সেই ঐতিহাসিক যাত্রার স্মৃতিচারণ করে রোনালদো বলেন, “২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং আমার জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল, আজ তার সমাপ্তি ঘটল। জাতীয় দলের হয়ে কাটানো বর্ণাঢ্য সময়ের দিকে ফিরে তাকালে কেবল ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথাই শুধু মনে পড়ে না।”
পরিশেষে নিজের দেশের কোটি কোটি সমর্থক ও প্রবাসীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি দেশের মানুষকে দেখি, বিদেশে বসবাস করা পর্তুগিজদের দেখি—যারা মাঠে বা টিভির সামনে ৯০ মিনিটের জন্য হলেও দেশকে আরও কাছাকাছি অনুভব করতেন। এমন লাখো পর্তুগিজ মানুষের কথা মনে পড়ে, যাদের হয়তো কখনো সামনাসামনি দেখিনি, অথচ তারা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছেন। কারণ, দিন শেষে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, ফুটবল হলো মানুষের জন্য এবং মানুষের আবেগের প্রকাশ।”