১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৭:৪১:৫৪ অপরাহ্ন


ইরান ইস্যুতে জাতিসংঘের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রকে এক হাত নিল রাশিয়া!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৯-২৭ ১৪:৪২:৩৫
ইরান ইস্যুতে জাতিসংঘের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রকে এক হাত নিল রাশিয়া! রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ I ছবি: সংগৃহীত


জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে সের্গেই লাভরভের তোপ; ইউক্রেন, গাজা, ভেনেজুয়েলা ও সাইবার সুরক্ষা ইস্যুতে রুশো-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধ চরম মাত্রায়

        নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া এক ক্ষুরধার ভাষণে ইরান, ভেনেজুয়েলা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের নীতি ও সামরিক পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, একক কোনো বিশ্ব পরাশক্তির অন্ধ আধিপত্য এখন পুরো পৃথিবীর সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তবে বৈশ্বিক গ্লোবাল সাউথ ও প্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের ‘সার্বভৌম উন্নয়নকেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করায় বর্তমানে এক নতুন ও ন্যায়সংগত বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উদ্ধৃত করে জাতিসংঘের ভাষণে লাভরভ বলেন, "বিশ্বজুড়ে মার্কিন একক আধিপত্যের স্বৈরতন্ত্র এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এটি আশপাশের সবার জন্যই চরম ঝুঁকিপূর্ণ।"

চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন বাহিনীর মাধ্যমে আটক করার কঠোর নিন্দা জানিয়ে লাভরভ এটিকে আইনবহির্ভূত ‘বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তার’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং অবিলম্বে তাঁদের মুক্তির জোর দাবি জানান।

একই সাথে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তাঁর পরিবার এবং দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর চালানো সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলাকে বিশ্বমঞ্চে ‘জবরদস্তিমূলক আন্তর্জাতিক একনায়কত্বের আরেকটি অগ্রহণযোগ্য প্রকাশ’ বলে আখ্যা দেন প্রবীণ এই কূটনীতিক।

লাভরভ ক্ষোভের সাথে যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিস্তৃত সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সরাসরি নিরাপত্তা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত ইরানের বেশ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনাতেও বিধ্বংসী বিমান হামলা চালানো হয়েছে। জাতিসংঘের এই তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার আওতাধীন পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থার এর মাধ্যমে যে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ সাধিত হলো, তা বিশ্বশান্তির পথকে চরমভাবে বিঘ্নিত করেছে।

সংকটাক্রান্ত গাজা ইস্যুতে লাভরভ বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত যুক্তরাষ্ট্রের বহুচর্চিত ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব বাস্তবে গাজায় কোনো টেকসই সমাধান বা শান্তি এনে দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে আজও অসংখ্য নিরীহ নারী, শিশু ও বৃদ্ধ প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন এবং সামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতি এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, "ইসরায়েল যেভাবে অবৈধভাবে জমি গ্রাস করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো ভূখণ্ডই অবশিষ্ট থাকবে না।" ফিলিস্তিনের পাশাপাশি লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, সুদান, সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধ ও সঙ্কট নিরসনে প্রথাগত ধারার বাইরে এসে জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। সেই সাথে কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বছরের পর বছর ধরে চাপিয়ে রাখা কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ অনতিবিলম্বে তুলে নেওয়ার পক্ষেও রাশিয়ার শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে ইউরোপীয় সরকারগুলোকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলে লাভরভ অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় শক্তিগুলো কিইভকে অবিরাম অস্ত্র সরবরাহ করে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলায় প্ররোচনা দিচ্ছে এবং মূল শান্তি আলোচনা বাধাগ্রস্ত করছে। তবে ওয়াশিংটনের ট্রাম্প প্রশাসনসহ বেশ কয়েকটি পক্ষ কূটনৈতিক টেবিলে বসে শান্তি আলোচনায় কিছুটা আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের পর ঐতিহাসিক নুরেমবার্গ বিচারের ৮০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গে লাভরভ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো সেই ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষাই নেয়নি; তারা আজ ইউক্রেনে উগ্র ‘ইউক্রেনীয় নাৎসিবাদ’ প্রশ্রয় দিচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, "সত্য ও ন্যায়ের জন্য আমাদের বিশেষ সামরিক অভিযান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং রাশিয়ার জন্য সব নিরাপত্তা হুমকি চিরতরে দূর করা হবে।"

আন্তর্জাতিক রাজকূটনীতিতে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রসঙ্গে জার্মানি বা জাপানকে ভেটো পাওয়ারসম্পন্ন নতুন স্থায়ী সদস্য করার তীব্র বিরোধিতা করেন লাভরভ। তাঁর দাবি, এই দুটি দেশ পুনরায় ‘সামরিকীকরণ ও প্রতিশোধপরায়ণতার পথ’ অবলম্বন করছে। এর পরিবর্তে তিনি উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারত ও ব্রাজিলকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য করার পাশাপাশি আফ্রিকার মহাদেশীয় প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করার জোর দাবি জানান।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী চীনের নেতৃত্বে এবং রাশিয়ার সমর্থনে একটি গ্লোবাল এআই পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাবও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থাপন করেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সর্বশেষে রাশিয়া ও বেলারুশের যৌথ উদ্যোগে নিউইয়র্কে গৃহীত সাম্প্রতিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে লাভরভ জানান, একবিংশ শতাব্দীর বৈচিত্র্যময় ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব নিশ্চিত করতে এক নতুন ‘ইউরেশীয় সনদ’ প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করেছে মস্কো।