১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৫:৪০:২৯ অপরাহ্ন


শতবর্ষেও কেন ফুরায়নি মহানায়ক উত্তমকুমারের জাদু!
বিনোদন ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৯-০৩ ১৪:০০:২৫
শতবর্ষেও কেন ফুরায়নি মহানায়ক উত্তমকুমারের জাদু! ছবি: ট্রেন্ডনিউজবিডি


জন্মশতবর্ষে মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে দুই বাংলা; জন্মবার্ষিকীতে কলকাতার নন্দনে চার দিনের বিশেষ আয়োজন

      বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক বা সুপারস্টারের অভাব কখনোই হয়নি, তবে 'মহানায়ক' অভিধায় সর্বজনগ্রাহ্য নাম আজও কেবল একজনই—উত্তমকুমার। Generations পার হলেও, সিনেমা দেখার মাধ্যম পাল্টালেও তাঁর চিরচেনা হাসি, চাহনি কিংবা নিখুঁত অভিনয়শৈলী আজও মলিন হয়নি। আজ ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা চলচ্চিত্রের এই অবিসংবাদিত মহানায়কের জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সমাজমাধ্যম থেকে শুরু করে দুই বাংলার চলচ্চিত্রানুরাগীদের মাঝে তাঁকে নিয়ে চলছে ব্যাপক স্মৃতিচারণা। জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে কলকাতায় আজ থেকে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী বিশেষ সম্মাননা ও স্মারক কর্মসূচি।


অরুণ কুমার থেকে ফ্লপ মাস্টার, অতঃপর 'মহানায়ক'

উত্তম কুমারের আসল নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ও মা চপলা দেবীর সন্তান অরুণের ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি প্রবল টান ছিল। তবে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনে কলকাতা পোর্ট কমিশনার্সের দপ্তরে কেরানির চাকরি নেন তিনি। জীবিকার জন্য চাকরি করলেও অন্তরের স্বপ্ন ছিল রূপালি পর্দা।

ক্যারিয়ারের শুরুর গল্পটি একেবারেই মসৃণ ছিল না। ১৯৪৭ সালে মুক্তি না পাওয়া হিন্দি ছবি 'মায়াডোর'-এ একটি ছোট চরিত্রে প্রথম কাজ করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে নীতিন বসু পরিচালিত 'দৃষ্টিদান' ছবির মাধ্যমে অরুণ কুমার নামেই তাঁর প্রথম পর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরের বছর 'কামনা' ছবিতে প্রথমবার নায়ক হিসেবে অভিনয় করলেও সেটি সফলতা পায়নি। এরপর 'মর্যাদা', 'সহযাত্রী', 'নষ্টনীড়', 'সঞ্জীবনী'সহ একের পর এক ছবি ব্যর্থ হলে চলচ্চিত্রপাড়ায় তাঁর গায়ে লেগেছিল 'ফ্লপ মাস্টার' তকমা। তবে চরম হতাশার মাঝেও তিনি অভিনয় ছেড়ে যাননি। এই সময়েই ধীরে ধীরে তাঁর পর্দার নাম হয়ে যায় উত্তমকুমার।


উত্তম কুমারের কালজয়ী পথচলার মূল মাইলফলক

সময়কাল / বছরঅর্জিত মাইলফলক ও বিবরণ
১৯৪৮'দৃষ্টিদান' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপালি পর্দায় আত্মপ্রকাশ।
১৯৫২'বসু পরিবার' ছবির মাধ্যমে একের পর এক ব্যর্থতার অধ্যায় কাটিয়ে প্রথম সফলতার মুখ দেখা।
১৯৫৩'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবির মাধ্যমে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কালজয়ী জুটির সূচনা।
১৯৬৬সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বিশ্ববিখ্যাত 'নায়ক' চলচ্চিত্রে অরিন্দম মুখার্জি চরিত্রে অনন্য অভিনয়।
১৯৬৭'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' ও 'চিড়িয়াখানা'য় অভিনয়ের জন্য চালুকৃত প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ।

ইমেজ ভাঙার সাহসিকতা ও বহুমুখী প্রতিভা

শুধুমাত্র রোমান্টিক নায়কের বাঁধাধরা ইমেজে নিজেকে আটকে রাখেননি উত্তমকুমার। তপন সিংহ পরিচালিত 'ঝিন্দের বন্দী'তে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুখোমুখি অভিনয়ের লড়াই টেক্কা দেন। সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' ছবিতে অরিন্দম মুখার্জি চরিত্রে তারকা জীবনের অন্তর্দাহ ও সংশয় ফুটিয়ে তোলা, 'চিড়িয়াখানা'য় গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী, কিংবা 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি'র নাম ভূমিকায় অভিনয় করে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন তিনি। ১৯৬৭ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ক্যাটাগরি চালু হলে প্রথম বিজয়ী হিসেবে এই খেতাব অর্জন করেন উত্তমকুমার।

অভিনেতা পরিচয়ের বাইরে প্রযোজক, পরিচালক, সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল বিস্তৃত। 'হারানো সুর' ছবিটির প্রযোজনা করে তিনি জাতীয় স্বীকৃতি পান। এছাড়া 'শুধু একটি বছর' ও 'বনপলাশীর পদাবলী' পরিচালনা করেন এবং 'নবজন্ম' ছবিতে গানও গান। প্রখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সঙ্গে পর্দায় তাঁর উপস্থিতির রসায়ন বাংলা সিনেমার গানে মায়াবী জাদু তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে হিন্দি সিনেমা 'ছোটি সি মুলাকাত'-এ আর্থিক ধাক্কা খেলেও 'অমানুষ' ও 'আনন্দ আশ্রম'-এর মাধ্যমে সর্বভারতীয় স্তরেও পরিচিতি পান।

পর্দার বাইরের জীবন ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েন

১৯৪৮ সালে গৌরী দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন উত্তম কুমার এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তারকাখ্যাতি বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যক্তিগত জীবনে টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং গৌরী দেবীর সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। এরপর অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, যাঁরা পর্দায়ও ছিলেন সফল জুটি। ষাটের দশকে উত্তমকুমার সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন এবং জীবনের শেষ ১৭ বছর সেখানেই অতিবাহিত করেন।

শতবর্ষে কলকাতায় বর্ণাঢ্য আয়োজন

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে ৩ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বর ও কলকাতার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে উদযাপিত হচ্ছে 'শতবর্ষে মহানায়ক'।

অনুষ্ঠানের দিনবিশেষ কার্যক্রম ও সময়সূচি
৩ সেপ্টেম্বরবিজলী সিনেমার সামনে মহানায়কের বিশাল কাটআউট উন্মোচন করবেন সন্দীপ রায়; সন্ধ্যায় নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বরে শোভাযাত্রা ও গগনেন্দ্র প্রদর্শনশালায় বিশেষ প্রদর্শনী।
৪ সেপ্টেম্বরইন্ডিয়া পোস্ট থেকে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ; 'নায়ক' প্রদর্শনের মাধ্যমে চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন ও স্বপন দাস নির্মিত তথ্যচিত্র প্রদর্শন।
৫-৬ সেপ্টেম্বর'নায়িকার চোখে উত্তমকুমার' ও 'অ্যাক্টিং অব উত্তমকুমার' শীর্ষক সেমিনার এবং বিশেষ সাংস্কৃতিক ও সংগীতানুষ্ঠান।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তাঁর রেডিও অনুষ্ঠান 'মন কি বাত'-এর ১৩৭তম পর্বে উত্তমকুমারের অধ্যবসায় ও কালজয়ী অর্জনের গভীর প্রশংসা করেন।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে 'ওগো বধূ সুন্দরী' ছবির শুটিং চলাকালে প্রয়াণ ঘটে এই মহানায়কের। প্রয়াণের ৪৬ বছর পেরিয়ে এবং জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলেও বাংলা সিনেমা ও বাঙালির সংস্কৃতিতে মহানায়ক হিসেবে আজও অটুট তাঁর নাম।