১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ১০:০৯:০১ অপরাহ্ন


মালয়েশিয়ার সঙ্গে ৩৩ পয়েন্টের যৌথ বিবৃতি: শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে দুই প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বৈঠক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | সোহেল জুলফিকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৬-২২ ১৮:৫৭:১৭
মালয়েশিয়ার সঙ্গে ৩৩ পয়েন্টের যৌথ বিবৃতি: শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে দুই প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন I ছবি: সংগৃহীত


রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়ায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ঐতিহাসিক ১৮ ঘণ্টার এক দ্বিপাক্ষিক সফর সম্পন্ন হয়েছে। সফর শেষে আজ সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় এক প্রেস কনফারেন্সে এই সফরের বিস্তারিত তথ্য ও অর্জনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্‌দী আমিন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সর্বপ্রথম অভিনন্দন জানানো বিশ্বনেতাদের অন্যতম ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম। রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফর এই দেশ থেকে শুরু করলেন। সফর শেষে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল চীনের উদ্দেশে রওনা হবে বলে জানানো হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত সফরসূচি ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক

প্রচলিত ধারার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী খুব ছোট একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে কুয়ালালামপুর পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং ২৩ জনের একটি অফিশিয়াল ডেলিগেশন, যার মধ্যে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেন মালয়েশিয়া সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী জুলকিফলি হাসান।

আজ পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় 'পারদানা পুত্রা'-য় দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথমে একান্ত বৈঠক, পরে সীমিত পরিসরে আলোচনা এবং সবশেষে ডেলিগেশন পর্যায়ে বৃহত্তর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজনৈতিক, বাণিজ্য, শ্রমবাজার ও আঞ্চলিক সহায়তাসহ মোট ৯টি খাতের অধীনে ৩৩টি পয়েন্টসংবলিত একটি যৌথ বিবৃতি ইস্যু করা হয়েছে। এছাড়া দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুটি 'এক্সচেঞ্জ অব নোটস' বিনিময় করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার মহামান্য রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গেও এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন।

শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্তকরণ ও কর্মী সুরক্ষা

বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় এই সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় দ্রুত উন্মুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীই এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে ব্যয় যথাসম্ভব কমাতে হবে, পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে হবে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক বর্তমানে অবৈধ অবস্থায় রয়েছেন কিংবা কারাগারে আছেন, তাঁদেরকে মানবিক ও সহানুভূতিশীল উপায়ে মালয়েশিয়ার বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বৈধতার আওতায় আনা অথবা নিরাপদে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন। বৈঠকে মালয়েশিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।

বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা

অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে দুই দেশ 'মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি' (এফটিএ) স্বাক্ষরের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এছাড়া হালাল শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব ও যৌথ গবেষণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সামরিক প্রশিক্ষণ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও উভয় দেশ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

জ্বালানি খাতে বিশেষ করে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার ও 'আরসিইপি'-তে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার পাঁচটি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া এবং এমএমসি পোর্ট-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।