কোয়েটা: পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সহিংসতা-জর্জরিত প্রদেশ বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটাতে একটি সামরিক ট্রেনকে লক্ষ্য করে চালানো ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। নজিরবিহীন এই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৭০ জন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির বরাত দিয়ে স্থানীয় পুলিশ সূত্র এই রক্তক্ষয়ী হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। হামলার পর পুরো কোয়েটা জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
হামলার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার (২৩ মে) কোয়েটার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার দিকে যাচ্ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বহনকারী একটি বিশেষ ট্রেন। ট্রেনটি যখন রেললাইনের পাশ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে এক আত্মঘাতী হামলাকারী তীব্র গতিতে চলন্ত ট্রেনের ওপর আছড়ে পড়ে। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ও ভয়াবহ ছিল যে, তার বিকট শব্দ কয়েক মাইল দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায়।
রেললাইনের পাশে ঘটে যাওয়া এই শক্তিশালী বিস্ফোরণের ধাক্কায় ট্রেনের কয়েকটি বগি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেবল ট্রেনের আরোহীই নন, এই পৈশাচিক হামলায় আশপাশে থাকা সাধারণ বেসামরিক লোকজনও প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া বিস্ফোরণের তীব্রতায় রেললাইনের চারপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে থাকা যানবাহন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পরপরই ওই এলাকায় বেশ কিছু সময় ধরে ভারী ও অবিরাম গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, যা উদ্ধারকাজে প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল।
হামলার দায় স্বীকার করল ‘বিএলএ’
এই ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানের নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (BLA) স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে এই আত্মঘাতী হামলার আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকার করেছে। সংগঠনটি দাবি করেছে, তাদের এলিট সুইসাইড স্কোয়াডের একজন সদস্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে এই আত্মঘাতী অভিযান পরিচালনা করেছে।
বেলুচিস্তান প্রাদেশিক স্বরাষ্ট্র বিভাগের বিশেষ সহকারী বাবর ইউসুফজাই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের বিশাল বহর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। আহতদের উদ্ধার করে কোয়েটার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (CMH) ও সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট ধরন নিশ্চিত করতে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট (CTD) ও ফরেনসিক দল চুলচেরা তদন্ত শুরু করেছে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অশান্ত বেলুচিস্তান
প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিপুল খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশটি গত কয়েক দশক ধরেই তীব্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা ও সশস্ত্র আন্দোলনের কারণে চরম অস্থিতিশীল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবহেলা ও সম্পদের অসম বণ্টনের অভিযোগ তুলে স্থানীয় বেলুচ সংগঠনগুলো পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলটি চীনের অর্থায়নে নির্মিত বহুল আলোচিত ও বিলিয়ন ডলারের ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (CPEC) প্রকল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত রুট। ফলে এই রুটে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও চীনা নাগরিকদের ওপর বিএলএ-এর পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যেই বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে, যা ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।