১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৬:০৪:০৯ অপরাহ্ন


অপ্রকাশিত মানসিক যন্ত্রণা: নীরব সংকটের মুখে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ
অনলাইন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৫-২৩ ১৫:৫১:৩১
অপ্রকাশিত মানসিক যন্ত্রণা: নীরব সংকটের মুখে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ


বাংলাদেশের অসংখ্য কিশোর-কিশোরী ও তরুণ আজ এমন এক মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যার বেশিরভাগই পরিবার, সমাজ কিংবা বন্ধুমহলের চোখে পড়ে না। বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও ভেতরে ভেতরে তারা বহন করছে হতাশা, ভয়, আত্মসম্মানহীনতা এবং একাকীত্বের গভীর ক্ষত। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এই অপ্রকাশিত মানসিক যন্ত্রণা একসময় আত্মবিধ্বংসী চিন্তার দিকেও ঠেলে দিতে পারে একজন মানুষকে।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা অনেকাংশেই ‘ট্যাবু’। পরিবারে সন্তান মন খারাপের কথা বললে অনেক সময় শুনতে হয়—“এত ভাবার কী আছে?”, “সবাই তো কষ্ট করে”, কিংবা “নামাজ পড়ো, ঠিক হয়ে যাবে।” ফলে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার বদলে তারা চুপ করে যাওয়া শিখে যায়।

বিশেষ করে তরুণদের জীবনে সবচেয়ে বড় সামাজিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই বহুল পরিচিত বাক্য—“মানুষ কী বলবে?” সমাজের চোখে ‘ভালো ছেলে’ বা ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় তারা নিজের প্রকৃত অনুভূতি, স্বপ্ন কিংবা দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। কেউ যদি মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তাকে ‘দুর্বল’, ‘অতিরিক্ত আবেগী’ কিংবা ‘পাগল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী কিংবা কলেজগামী তরুণদের একটি বড় অংশ পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার ভারে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। ভালো ফলাফল, দ্রুত চাকরি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সম্পর্কের চাপ—সব মিলিয়ে তারা এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার মধ্যে বাস করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অন্যের ‘সফল’ জীবন দেখে নিজের বাস্তবতাকে ব্যর্থ মনে করছেন অনেকেই।

সামাজিক রীতি-রেওয়াজ এবং প্রচলিত কিছু ধারণাও এই সংকটকে গভীর করছে। এখনো অনেক পরিবারে ছেলেদের শেখানো হয়—“ছেলেরা কাঁদে না।” অন্যদিকে মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পছন্দ বা মানসিক অবস্থার চেয়ে সামাজিক ‘সম্মান’কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে দুই পক্ষই নিজেদের আবেগ চেপে রাখতে রাখতে একসময় মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে চাপ, অবহেলা ও অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ না থাকলে একজন তরুণ ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করে। সেখান থেকে জন্ম নিতে পারে আত্মঘৃণা, নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়া, এমনকি আত্মবিধ্বংসী চিন্তাও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘লজ্জার বিষয়’ নয় বরং স্বাস্থ্যসেবারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পরিবারে সন্তানদের কথা শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা বাড়ানো এবং সামাজিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

তাদের ভাষায়, “একজন তরুণ যখন বলে সে ভালো নেই, তখন তাকে উপদেশের আগে প্রয়োজন বোঝাপড়া। কারণ অনেক সময় একটি আন্তরিক কথোপকথনই কাউকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।”

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ শুধু অর্থনৈতিক বা শিক্ষাগত চাপেই নয়, বরং অদৃশ্য মানসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়েও যাচ্ছে। সেই যুদ্ধকে অস্বীকার না করে গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে একটি সুস্থ প্রজন্ম গঠনের প্রথম পদক্ষেপ।