১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৭:০৫:০৪ অপরাহ্ন


সরকারের তথ্যে ভুল ও আইনি শূন্যতার শঙ্কা: সদ্যবিদায়ী মানবাধিকার কমিশনারদের খোলা চিঠি
অনলাইন ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৪-১৩ ১৪:২২:২৬
সরকারের তথ্যে ভুল ও আইনি শূন্যতার শঙ্কা: সদ্যবিদায়ী মানবাধিকার কমিশনারদের খোলা চিঠি


জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পাঁচজন সদ্যবিদায়ী কমিশনার সরকারের সাম্প্রতিক কিছু আইনি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে একটি যৌথ 'খোলা চিঠি' প্রকাশ করেছেন। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মো. নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো. শরীফুর ইসলাম এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে যে, সংসদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের সপক্ষে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিশনারদের মতে, এর ফলে দেশে একটি বিপজ্জনক 'আইনি শূন্যতা' তৈরি হয়েছে, যা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

ভুল তথ্যের জবাব ও আইনি ব্যাখ্যা

চিঠিতে কমিশনাররা পয়েন্ট ধরে ধরে সংসদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন:

  • সাজার বিভ্রান্তি: সংসদে বলা হয়েছিল গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর, যা ভুক্তভোগীদের প্রতি অবিচার। কমিশনাররা প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, বাতিলকৃত অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রাভেদে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের স্পষ্ট বিধান ছিল।

  • তদন্ত ও জরিমানা: অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা নেই বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা-ও নাকচ করেছেন তাঁরা। তাঁরা জানান, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও গুম অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা এবং জরিমানার পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ ছিল।

  • আইসিটি বনাম গুম অধ্যাদেশ: একটি বড় বিতর্ক ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) আইন নিয়ে। কমিশনাররা স্পষ্ট করেছেন, আইসিটি কেবল 'গণহারে' সংঘটিত গুমের বিচার করতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি বিচ্ছিন্নভাবে গুমের শিকার হন, তবে বর্তমান আইনে তাঁর বিচার পাওয়ার আর কোনো পথ রইল না। কারণ গত ১১ এপ্রিল অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার পর থেকে 'গুম' এখন আর কোনো সংজ্ঞায়িত ফৌজদারি অপরাধ নয়।

সরকারের ‘প্রকৃত আপত্তি’ ও কমিশনের স্বাধীনতা

চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সরকার আসলে মানবাধিকার কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা খর্ব করতে চায়। এর স্বপক্ষে তাঁরা তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. কমিশনকে রাষ্ট্রপতি বা বিচার বিভাগের পরিবর্তে সরাসরি আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার চেষ্টা।
২. নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের আগে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়ার শর্ত আরোপ করা, যা তদন্তের নিরপেক্ষতা নষ্ট করবে।
৩. কমিশনার বাছাই কমিটিতে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়িয়ে দলীয়করণের পথ প্রশস্ত করা।

জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

সদ্যবিদায়ী কমিশনাররা আরও জানান, জুলাই অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরনো আইন বহাল করায় এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন জুলাই আন্দোলনে আহত বা নিহতদের ঘটনার তদন্ত করবে সেই সব বাহিনী, যারা নিজেরাই ওই সময় অভিযুক্ত ছিল। অর্থাৎ, যে তরুণেরা রাস্তায় লড়াই করেছেন, তাঁদের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব এখন তাঁদেরই হাতে, যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন।

পরিশেষে, কমিশনাররা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, গুম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন শক্তিশালী অধ্যাদেশগুলো বাতিল না করে বরং প্রয়োজনীয় সংশোধনের পথে হাঁটা হলো না? যে পরিবারগুলো এখনো নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় দিন গুনছে, তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কেবল শক্তিশালী ও স্বাধীন আইনেই সম্ভব।