১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার, ০৬:৪৬:২১ অপরাহ্ন


‘ইসলামিক বোমা’: ইরানকে পরমাণু শক্তিধর করতে পাকিস্তানের গোপন উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | সোহেল জুলফিকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৪-০৯ ১৭:১৩:৩৭
‘ইসলামিক বোমা’: ইরানকে পরমাণু শক্তিধর করতে পাকিস্তানের গোপন উদ্বেগ পাকিস্তানি বিজ্ঞানী ড. আব্দুল কাদির খান (এ কিউ খান) ছবি: সংগৃহীত


পাকিস্তানি বিজ্ঞানী ড. আব্দুল কাদির খান (এ কিউ খান) এবং তার ‘ইসলামিক বোমা’র স্বপ্ন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

১. জুলফিকার আলি ভুট্টো ও ‘ইসলামিক বোমা’র দর্শন

১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার (স্মাইলিং বুদ্ধ) পর পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো মরিয়া হয়ে ওঠেন। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল:

“আমরা ঘাস খাব, প্রয়োজনে না খেয়ে থাকব, তবুও পরমাণু বোমা বানাব।”

ভুট্টোর দর্শন ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমতা। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি খ্রিস্টান, ইহুদি ও হিন্দুদের ‘বোমা’ থাকতে পারে, তবে মুসলিম বিশ্বের কেন থাকবে না? এই লক্ষ্য পূরণের কারিগর হিসেবে তিনি বেছে নেন ড. এ কিউ খানকে।

২. ড. এ কিউ খান: চুরিকৃত নকশা থেকে পারমাণবিক শক্তি

নেদারল্যান্ডসের ইউরেঙ্কো (Urenco) সংস্থায় কর্মরত থাকাকালীন এ কিউ খান সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তির গোপন নকশা সংগ্রহ করেন। তার অবদান ছিল দ্বিবিধ:

  • স্বদেশি অর্জন: ১৯৯৮ সালে সফল পরীক্ষার মাধ্যমে পাকিস্তানকে বিশ্বের সপ্তম ও একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত করা।

  • আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক: পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তিনি ইরান, উত্তর কোরিয়া এবং লিবিয়াকে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেন।

৩. ইরানকে সহায়তার গোপন অধ্যায়

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তারা পাকিস্তানের সাহায্য চায়। ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে কাদির খানের নেটওয়ার্ক ইরানকে কয়েক হাজার ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ এবং নকশা সরবরাহ করে। ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাশেমি রাফসানজানি পরে স্বীকার করেন যে, যুদ্ধের সময়ে বিকল্প হিসেবে তারা এই প্রযুক্তি চেয়েছিলেন।

৪. ইসরাইলি বাধা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা

ইসরাইল শুরু থেকেই মুসলিম বিশ্বের এই পরমাণু সক্ষমতার ঘোর বিরোধী ছিল।

  • হামলার পরিকল্পনা: ১৯৮০-র দশকে ইসরাইল ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করে পাকিস্তানের ‘কাহুতা’ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে চেয়েছিল, যা ইন্দিরা গান্ধী পরে বাতিল করেন।

  • মোসাড বনাম খান: মোসাড ও সিআইএ দীর্ঘ সময় খানের ওপর নজর রাখলেও তার নেটওয়ার্কের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হয়। মোসাডের সাবেক প্রধান শাবতাই শাভিত পরে আক্ষেপ করেছিলেন যে, কাদির খানকে হত্যা না করা ছিল তাদের অন্যতম বড় ভুল।

৫. নেটওয়ার্কের পতন ও স্বীকারোক্তি

২০০৩ সালে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে এ কিউ খানের নেটওয়ার্কের তথ্য ফাঁস করে দেন। ২০০৪ সালে ড. খান টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে সব দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেন। তবে তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি কেবল দেশ ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থেই কাজ করেছেন।

বছরঘটনা
১৯৭৪ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষা; এ কিউ খানের ভুট্টোর কাছে চিঠি।
১৯৮৬-৮৭ইরানকে পারমাণবিক নকশা ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ শুরু।
১৯৯৮পাকিস্তানের সফল পারমাণবিক পরীক্ষা (চাগাই-১)।
২০০৩লিবিয়ার মাধ্যমে কাদির খানের গোপন নেটওয়ার্ক ফাঁস।
২০০৪এ কিউ খানের গৃহবন্দিত্ব ও স্বীকারোক্তি।

এ কিউ খানের যুক্তি ছিল বাস্তববাদী ও প্রতিরোধমূলক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইরাক ও লিবিয়ার মতো দেশগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের ওপর আক্রমণ করার সাহস পেত না। আজ ইরান যে পারমাণবিক সক্ষমতার দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এবং যার জেরে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে, তার বীজ বপন করেছিলেন এই পাকিস্তানি বিজ্ঞানীই।

ড. কাদির খানের এই ‘বিস্ময়কর রূপান্তর’ এবং তার কর্মকাণ্ড আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত ও রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।