পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস রমজানের শেষ দশক সমাগত। এই দশকের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি হলো ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রাত। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কদরে এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতের বরকত লাভে বিশেষ কিছু আমল করার জোর তাকিদ দিয়েছেন।
একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী উৎস থেকে যাচাইকৃত নবীজি (সা.) নির্দেশিত প্রধান আমলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ক্ষমার বিশেষ দুআ পাঠ
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কদরের রাতে কী দুআ পড়তে হবে? নবীজি (সা.) তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
(উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি)
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (সুনানে তিরমিজি: ৩৫১৩)
২. গভীর শ্রদ্ধায় নফল নামাজ (কিয়ামুল লাইল)
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে (নামাজে) দাঁড়িয়ে থাকবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।" (বুখারি: ১৯০১)। দীর্ঘ কিরাত ও দীর্ঘ সেজদাহর মাধ্যমে নফল নামাজ আদায় করা এই রাতের অন্যতম প্রধান কাজ।
৩. শেষ দশকের ইতিকাফ
রাসুলুল্লাহ (সা.) কদরের রাতের ফজিলত নিশ্চিত করতে রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতিকাফ করতেন। তিনি বলেছেন, "তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।" (সহিহ বুখারি: ২০১৭)। ইতিকাফের মাধ্যমে একজন মুমিন দুনিয়ার সব কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকার সুযোগ পান।
৪. পরিবারকে ইবাদতে উৎসাহিত করা
নবীজি (সা.) কেবল নিজে ইবাদত করতেন না, বরং পরিবারের সদস্যদেরও এই রাতের বরকত লাভে সচেষ্ট রাখতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, রমজানের শেষ ১০ দিন শুরু হলে নবীজি (সা.) সারা রাত জেগে থাকতেন, কোমরে কাপড় বেঁধে (তীব্র একাগ্রতায়) ইবাদত করতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও জাগিয়ে দিতেন। (সহিহ মুসলিম: ১১৭৪)
৫. কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির
যেহেতু এই রাতেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, তাই এই রাতে অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত বরকতময়। এছাড়া তাসবিহ, তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এবং দরুদ পাঠের মাধ্যমে জিহ্বাকে সিক্ত রাখা নবীজির সুন্নাহ।
নবীজি (সা.) নির্দিষ্ট কোনো একটি রাতকে (যেমন কেবল ২৭শে রমজান) কদর হিসেবে সুনির্দিষ্ট করেননি, বরং শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) এটি খুঁজতে বলেছেন।
বিদাআত বর্জন: এই রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে (যেমন প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট সুরা নির্দিষ্ট সংখ্যক বার পড়া) নামাজ পড়ার কোনো সহিহ ভিত্তি হাদিসে নেই। স্বাভাবিক নফল নামাজের নিয়মেই দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজ পড়া উত্তম।