সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা আবারও জানতে চাইছেন—এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইসলামের নির্দেশনা কী? হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিভিন্ন হাদিসে মানবজাতিকে দুর্যোগের সময় কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী বলতে হবে, এবং কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে—সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দিয়েছেন।
ইসলামী শিক্ষাবিদরা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল ভয় বা আতঙ্কের বিষয় নয়; বরং এটি মানুষের জন্য সতর্কবার্তা, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ। নিচে প্রামাণ্য হাদিসগ্রন্থের ভিত্তিতে নবীজির (সা.) নির্দেশনাগুলো তুলে ধরা হলো।
ভূমিকম্প বা আকস্মিক বিপর্যয়ে নবীজির (সা.) নির্দেশনা
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করা (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা)
ভূমিকম্প, ঝড়, আকস্মিক বিপদ—এসব ঘটলে নবীজির প্রথম নির্দেশনা ছিল আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা।
-
হাদিসে এসেছে:
“যখন ভূমিকম্প, সূর্যগ্রহণ বা অন্য কোনো আলামত দেখা দাও, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণ করো, দোয়া করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস 1044
২. বেশি বেশি দোয়া করা, কান্নাকাটি করা
নবীজির (সা.) সুন্নাহ হলো—দুর্যোগের সময় আল্লাহর দয়া কামনা করা।
-
সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে:
“দুঃসময় ও বিপদের মুহূর্তে নবী (সা.) দোয়া করতেন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন।”
— সহিহ মুসলিম, কিতাবুল যিকর
৩. নামাজ আদায় করা (বিশেষত নফল/সালাতুল হাজাত)
সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের সময় বিশেষ নামাজ আছে; কিন্তু ভূমিকম্পের জন্য নির্দিষ্ট নামাজ নেই। তবে হাদিসে আছে—যখন কোনো ধরনের ভয় বা বিপদ দেখা দিত, নবী (সা.) নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।
-
“যখন কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটত, নবী (সা.) নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস 1050
শরিয়াহবিদদের মতে, দুর্যোগে নফল সালাত, সালাতুল হাজাত, এবং কুরআন তিলাওয়াত সুন্নাহ হিসেবে গণ্য হয়।
৪. আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা (যিকর)
নবীজির (সা.) নির্দেশ: কঠিন সময় আল্লাহর স্মরণে মুখর থাকা।
-
দোয়া:
“লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
— দুর্দশা ও বিপদের দোয়া, সহিহ মুসলিম
৫. পরস্পরকে সাহায্য করা ও ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা
দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামি শিক্ষা।
-
হাদিস:
“মুমিন মুমিনের ভাই; সে ভাইকে সাহায্য করে, পরিত্যাগ করে না।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস 2580
৬. বিপর্যয়কে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা, অহংকার ত্যাগ করা
ইসলামে দুর্যোগকে মানুষের জন্য শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—যাতে মানুষ নিজেকে সংশোধন করে।
-
“এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেন।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস 1052
ভূমিকম্পের সময় পড়ার সুন্নাহ দোয়া
দুর্যোগ বা আতঙ্কের মুহূর্তে সুন্নাহ অনুযায়ী দোয়া:
১. “আল্লাহুম্মা ইননি আউযুবিকা মিন জাওয়ালি নি’মাতিক...”
(হে আল্লাহ! তোমার নেয়ামত হারানো থেকে আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই।)
— সুনান নাসায়ী
২. “আল্লাহুম্মা লা তু’আখিযনা…”
(হে আল্লাহ! আমাদেরকে ধ্বংস করে দিও না, আমাদেরকে ক্ষমা করো।)
— সহিহ মুসলিম
৩. “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।”
— সহিহ বুখারি
ইসলামিক দৃষ্টিতে দুর্যোগে করণীয়: সারসংক্ষেপ
-
তাওবা ও ইস্তিগফার
-
দোয়া ও যিকর
-
নফল নামাজ
-
মানুষের পাশে দাঁড়ানো
-
ভয় বা আতঙ্কে অশালীন কথা না বলা
-
নিজের ভুল সংশোধন করা
-
আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখা
ইসলামের দৃষ্টিতে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়—এটি মানুষের জন্য আত্মবিশ্লেষণ, আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান এবং পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা। হযরত মুহাম্মদ (সা.) পরিষ্কারভাবে বলেছেন—এসময় মুসলমানদের উচিত নামাজ, দোয়া, ইস্তিগফার, ধৈর্য এবং মানবসেবার মাধ্যমে সঠিক আচরণ করা।
সুতরাং দুর্যোগের সময়ে আতঙ্কে নয়—বরং নবীজির (সা.) প্রদত্ত নির্দেশ অনুসরণই মুসলমানদের জন্য প্রকৃত দিকনির্দেশনা।