কিডনি আবার গজাবে– দালালের কথায় যে গ্রাম হয়ে ওঠে ‘কিডনি ভ্যালি’


আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি , আপডেট করা হয়েছে : 05-10-2026

কিডনি আবার গজাবে– দালালের কথায় যে গ্রাম হয়ে ওঠে ‘কিডনি ভ্যালি’
অভাবের সুযোগে অঙ্গ পাচারচক্রের প্রতারণা; নেপালে পুরোনো ক্ষত মিটতে না মিটতেই সীমান্তজুড়ে নতুন মানব পাচারের আশঙ্কাজনক উন্মোচন

     "একটি বিক্রি করে দিলে শরীরে কোনো ক্ষতি হবে না, কিছুদিন পর কিডনি আবার অলৌকিকভাবে গজিয়ে উঠবে"—অসাধু মানব পাচারকারী ও দালালের চরম ও অদ্ভুত এই মিথ্যা প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে নিজেদের মহামূল্যবান অঙ্গ বিক্রি করেছিলেন নেপালের এক প্রত্যন্ত গ্রামের শতাধিক অসচ্ছল অধিবাসী। চরম দারিদ্র্য, অভাব-অনটন আর সচেতনতার অভাবে পুরো গ্রামটির প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে অঙ্গ হারানোর এই করুণ ইতিহাস একসময় গ্রামটিকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি দেয় ‘কিডনি ভ্যালি’ (Kidney Valley) নামে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সেই ভয়াবহ প্রতারণার ক্ষত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আজও বহয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

নেপালের কভরেপালানচক জেলার ঐতিহ্যবাহী 'হোকসে' গ্রাম। একসময় চরম অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে মানব অঙ্গ পাচারকারী চক্রের দালালেরা ভিড় জমাত এই গ্রামে। কাঞ্চা ও রাম নামের দুই স্থানীয় ভুক্তভোগী অধিবাসী জানান, অস্ত্রোপচারের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দরুন তারা আর কোনো ধরনের ভারী শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন না; তীব্র দৈহিক যন্ত্রণায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতারকরা সরলমনা গ্রামবাসীদের ভুল বুঝিয়ে ও অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে গোপনে অঙ্গ কেটে নিয়েছে। ভুল অস্ত্রোপচার ও সঠিক চিকিৎসাসেবার অভাবে ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তির করুণ মৃত্যুও ঘটেছে সেখানে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হোকসে গ্রামের অধিবাসীরা এই কলঙ্কিত বদনাম কাটিয়ে ওঠার সার্বিক আপ্রাণ চেষ্টা করলেও নেপালের চরম দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান সংকট দেশেটির মানুষকে পুনরায় এক নতুন গভীর কিডনি-সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম 'স্কাই নিউজ'-এর এক বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়—মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশসমূহ ও মালয়েশিয়ায় গমনেচ্ছুক নেপালি অভিবাসী শ্রমিকদের অনেকে চড়া খরচের ঋণ মেটাতে বাধ্য হয়ে নিজেদের কিডনি বিক্রি করছেন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে, প্রবাসে তীব্র তাপদাহ, পানিশূন্যতা এবং অমানবিক কঠিন কর্মপরিবেশের কারণে অসংখ্য সুস্থ শ্রমিক মারাত্মক 'কডনি বিকল' রোগ নিয়ে দেশে ফিরে আসছেন।

সংকটটি নতুন করে আন্তর্জাতিক মাত্রায় রূপ নিয়েছে নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি' (CESLAM)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত তথ্যমতে, বর্তমানে নেপাল-ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ব্যবহার করে এক নতুন ভয়ঙ্কর ও আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচার সিন্ডিকেট চরমভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের বিভিন্ন বড় বড় রেস্তোরাঁ ও হোটেলে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অসচ্ছল নেপালি তরুণদের সীমান্ত পার করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরবর্তীকালে চক্রটি তাঁদের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে জিম্মি করে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে বলপূর্বক কিডনি অপসারণ করছে।

২০২৫ সালে সিন্ধুলি জেলার এক তরুণ এমনই এক আন্তর্জাতিক চক্রের ভয়াবহ শিকার হন। ভারতে প্রায় এক মাস জিম্মি রেখে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও তাকে জোরপূর্বক অচেতন করে বাম কিডনি কেটে নেওয়া হয়। অঙ্গটির বিনিময়ে তাকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ৬ লাখ রুপির পরিবর্তে দেশে ফেরার সময় হাতে মাত্র ১০ হাজার রুপি ধরিয়ে দেয় পাচারকারীরা। পরবর্তীতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি নেপালের 'অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো' (AHTIB)-তে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

নেপালি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যমতে, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পরা ও দুর্বল মানুষদের উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারচক্রে জিম্মি করার এক সুসংগঠিত নীল নকশা। ফলে একদিকে অতীত ‘কিডনি ভ্যালি’র নির্মম অভিশাপ, আর অন্যদিকে আধুনিক সীমান্ত পাচার—দুইয়ের জটিল সংকটে পিষ্ট হচ্ছে নেপালের সাধারণ ও নিঃস্ব মানুষ।


অফিস: নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০

ইমেইল : info@trendnewsbd.com