কিছু দুষ্টু মানুষ দেশে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী


জাতীয় ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি , আপডেট করা হয়েছে : 01-10-2026

কিছু দুষ্টু মানুষ দেশে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
ফেনীতে নদী পুনঃখনন প্রকল্প উদ্বোধন ও ফ্যামিলি কার্ড প্রদান কর্মসূচির সূচনা; অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার তারেক রহমানের

        বাংলাদেশ ২০ কোটি মানুষের এক সুবিশাল দেশ, যেখানে ইতিবাচক মনোভাবের মানুষের পাশাপাশি কিছু সুনির্দিষ্ট অসাধু চক্র আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের জনগণ আস্থা রেখে বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে; তাই সার্বিক সর্বশক্তি নিয়োগ করে সরকার প্রমাণ করবে যে—আইন সবার জন্য সমান এবং দেশে যেকোনো মূল্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ৩টায় ফেনীর পরশুরাম উপজেলার ঐতিহাসিক ঘাটঘর মুহুরী ব্রিজ এলাকায় আয়োজিত ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন’ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে বেলা ২টায় হেলিকপ্টারযোগে ফেনীতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তীতে বেলা আড়াইটায় তিনি বহুল প্রতীক্ষিত মুহুরী-কহুয়া নদী পুনঃখনন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "বিগত ১৭ বছর ধরে এ দেশে আইনের শাসনকে সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল। আমরা সেই ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে ধাপে ধাপে পরিবর্তন করে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দল নতুন করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা ও পাঁয়তারা চালাচ্ছে।"

নাম উল্লেখ না করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থানের কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "একটি গুপ্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা আজকাল আমাদের উপদেশ ও নসিহত দিচ্ছেন। তাঁদের প্রতি আমার স্পষ্ট পরামর্শ—আগে নিজেদের দলের ভেতরে ও ঘরের দিকে নজর দিন। তাঁদের নিজস্ব কিছু সদস্য সরাসরি নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় বিস্তারিত মন্তব্য করব না, তবে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সত্যটা চলে এসেছে যে—তাদের এক নেতা কেবল নির্যাতন করেই থেমে থাকেননি, একটি তাজা মানুষের জীবন পর্যন্ত প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছেন।"

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, "তারা গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জনগণকে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যে বিভ্রান্ত করে কয়েকটি আসনে জয়লাভ করেছিল। এরপর থেকেই তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করেছে। অথচ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা কী ছিল, কীভাবে তারা আমাদের মা-বোনদের ওপর নির্যাতন ও গণহত্যা চালিয়েছিল—তা এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ ভালো করেই জানে। দুঃখজনকভাবে তারা আবারও সেই পুরনো অরাজকতা ও নারী নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে।"

ফেনী অঞ্চলের রাজনৈতিক ত্যাগের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ফেনীর শত শত নেতা-কর্মী গত ১৭টি বছর ধরে ভয়াবহ গুম, খুন ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এখন সময় এসেছে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার এবং এসব ষড়যন্ত্রকারী ও অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের রাজপথে ও রাজনৈতিকভাবে সমুচিত জবাব দেওয়ার।

উদ্বোধনকৃত কৃষি ও পানিসম্পদ প্রকল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "মুহুরী ও কহুয়া নদী পুনঃখননের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। মাত্র দুই-আড়াই বছর আগে এই অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যায় এই ব্রিজের ওপর দিয়ে প্লাবনের পানি প্রবাহিত হয়েছিল। আগামীতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও টেকসই বন্যা প্রতিরোধ করতেই আমাদের এই বাস্তবমুখী উদ্যোগ, যা ছিল আমাদের নির্বাচনি প্রধান অঙ্গীকার।"

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, "সারাদেশে খাল ও নদী খনন কর্মসূচি প্রথম শুরু করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপি সার্বিকভাবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দল, তাই এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি আমরা এগিয়ে নিচ্ছি। এই প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সাড়ে চার লাখ মানুষ সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন। পাশাপাশি প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে স্থানীয় কৃষকরা সেচ সুবিধা পাবেন, যার ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন অন্তত ১ লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদনে জোয়ার আসলে কৃষকের নিট লাভ বাড়বে, যার ইতিবাচক প্রভাবে দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সহজ হবে।"

কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষিঋণ পূর্ণাঙ্গ মওকুফ করেছে। এতে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও সারাদেশের প্রায় ১৩ লাখ কৃষক সরাসরি ঋণের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী প্রসারিত করার নতুন ঘোষণার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তিক পরিবার ও খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে আমরা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দিতে চাই। ফেনী থেকেই আজকে সেই ঐতিহাসিক কর্মসূচির শুভ সূচনা হচ্ছে, যেখানে আমি নিজে মায়েদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। এর মূল লক্ষ্য হলো পিছিয়ে পড়া পরিবারের গৃহিণী ও মায়েদের আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী করে তোলা। একইভাবে কৃষকদের সুবিধার জন্য খুব শীঘ্রই ডিজিটাল ‘কৃষি কার্ড’ বিতরণ করা হবে।"

দেশের স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে উন্নত করে ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় বসে আধুনিক চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস, শিশু ও মাতৃত্বকালীন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সাশ্রয়ী মূল্যে সহজে পাবেন।

আয়োজিত এ বিশেষ সুধী সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম মজনু এবং পরশুরাম উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল হালিমসহ উর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

পরশুরামের সরকারি কর্মসূচি সমাপ্ত করে বেলা সোয়া ৩টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুলগাজী উপজেলার বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে গমন করেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি কলেজ প্রাঙ্গণে একটি স্মারক বৃক্ষরোপণ করেন এবং পরবর্তীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কুশল বিনিময় ও দিকনির্দেশনামূলক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। শিক্ষার্থীরা আসন্ন পরীক্ষায় ভালো সাফল্য প্রদর্শন করলে কলেজটিকে জাতীয়করণের ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।


অফিস: নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০

ইমেইল : info@trendnewsbd.com