বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি এবং বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে বেইজিংয়ের জোরালো ভূমিকা ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রাষ্ট্রপতির সাথে এক অন্তর্বর্তীকালীন সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হলে তিনি এই আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকালে জটিল রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের গঠনমূলক ও কূটনৈতিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ ও রাখাইন রাজ্যে টেকসই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চীনের চলমান বহুমুখী উদ্যোগ অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।"
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG), বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV), লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর এবং উদ্ভাবনী সৌরশক্তি খাতে চিনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
একই সাথে কুনমিং-চট্টগ্রাম করিডর এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরসহ আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, "আঞ্চলিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক স্বার্থরক্ষায় বাংলাদেশ চীন ও অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সর্বদা প্রস্তুত।" তিনি মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, ধারণক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং আনোয়ারায় 'চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন' প্রতিষ্ঠার যৌথ উদ্যোগকে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন।
জলবায়ু ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আলোচনা সাপেক্ষে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ইতিবাচক অবদানের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি স্মরণ করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের চীন সফর এবং সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিলে নিজের নেতৃত্বে শীর্ষ প্রতিনিধি দল ও তরুণ শিক্ষার্থীদের চীন সফরের কথা। রাষ্ট্রপতির মতে, এসব পারস্পরিক উচ্চপর্যায়ের সফর দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের ভিত্তিকে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করেছে। তিনি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেন।
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক 'বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল' নির্মাণ ও অর্থায়নের জন্য চিনা সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। একই সাথে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) সাধারণ জনগণের চিকিৎসার সুবিধার কথা বিবেচনা করে জটিল ব্লাড ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসায় চিনা প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ সহযোগিতা চান রাষ্ট্রপতি। জবাবে বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ বিষয়ে ইতিবাচক সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস প্রদান করেন।
সাক্ষাৎ পর্বের শেষভাগে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য ও উজ্জ্বল কর্মজীবন কামনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, "দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদান বাংলাদেশ বরাবরের মতো কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখবে।"
বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, প্রশাসনিক সচিব, প্রেস সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন ড. লিই ইউইনসহ উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।