প্রেক্ষাগৃহ ও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নামকরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বহুল প্রশংসিত হওয়ার পর অবশেষে ঘরে বসেই দেখা যাবে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত আলোচিত সিনেমা ‘মায়ার জঞ্জাল’। দীর্ঘ ১৯ বছর পর এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালী পর্দায় ফিরেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী অপি করিম। সিনেমাটি আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টায় (২৪ সেপ্টেম্বর) দেশীয় জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘চরকি’-তে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পাচ্ছে। এটি অপি করিম অভিনীত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র।
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি বিখ্যাত ছোটগল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’ ও ‘সুবালা’র প্রেক্ষাপট অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন ওপার বাংলার খ্যাতিমান নির্মাতা ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী—যিনি এর আগে ‘ফড়িং’ ও ‘ভালোবাসার শহর’ বানিয়ে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন। চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন বাংলাদেশের জসীম আহমেদ ও নির্মাতা ইন্দ্রনীল স্বয়ং।
প্রায় দুই দশক পর নতুন কোনো চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে অভিনেত্রী অপি করিম বলেন, "প্রথমে লেখাপড়া এবং পরবর্তীতে কাজের ব্যস্ততার কারণে চলচ্চিত্রে নিয়মিত হওয়া ওঠেনি। তবে নির্মাতা ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর কাজের ধরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। বিশেষ করে তাঁর “ভালোবাসার শহর”-এ জয়া (আহসান) আপুর অভিনয় দেখে আমারও নতুন করে কাজ করার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। পাশাপাশি সহশিল্প হিসেবে ঋত্বিক চক্রবর্তীর উপস্থিতি এবং স্ক্রিপ্টের অত্যন্ত প্রাকৃতিক গল্প ও চরিত্রগুলো আমাকে কাজটি করতে উৎসাহিত করেছিল।"
সিনেমাটিতে অপি করিমের চরিত্রের নাম ‘সোমা’। তাঁর স্বামীর ‘চন্দন’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। চলচ্চিত্রে সমান্তরাল দুটি গল্পে দেখা যায়, সমাজ থেকে ছিটকে পড়া দুজন সাধারণ মানুষ সোমা ও চন্দন কীভাবে নগরজীবনের কঠিন বাস্তবতায় টিকে থাকার পথ খোঁজে। আবেগ, বাস্তবতা ও জীবনের নির্মম রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক।
নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী জানান, প্রাত্যহিক জীবনের চেনা গণ্ডির বাইরে চন্দন বা চাঁদু চরিত্রটির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটগুলোকে অত্যন্ত নিখুঁত ও নিবিড়ভাবে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটিতে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের সোহেল মন্ডল। নিজের ‘সত্য’ চরিত্রটি নিয়ে তিনি বলেন, "আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের এই কাজটির জন্য আমি 'ফিল্মফেয়ার বাংলা' পুরস্কারে সেরা নবাগত অভিনেতার সম্মাননা পেয়েছিলাম। এটি আমার অভিনয়ের ভিত তৈরি করেছিল। অবশেষে সিনেমাটি ওটিটিতে উন্মুক্ত হওয়ায় সাধারণ দর্শকরা সহজেই এটি দেখতে পাবেন, যা অত্যন্ত আনন্দের।"
চলচ্চিত্রটিতে অপি করিম, ঋত্বিক চক্রবর্তী ও সোহেল মন্ডল ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করেছেন কলকাতার প্রবীণ অভিনেতা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু ও চান্দ্রেয়ী ঘোষ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘মায়ার জঞ্জাল’-এর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। ২০২০ সালে মর্যাদাপূর্ণ সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ‘এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট’ বিভাগে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। একই বছর মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও এটি অফিশিয়াল সিলেকশন পায়। পরবর্তীতে ইতালির ২১তম এশিয়াটিকা চলচ্চিত্র উৎসবে পূর্ণদৈর্ঘ্য বিভাগে জুরি অ্যাওয়ার্ড, কলকাতার আর্টহাউস এশিয়া চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্রের পুরস্কার এবং ২০২২ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের সম্মাননা লাভ করে এটি। তাছাড়া ২০২৪ সালের 'ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা'-য় সিনেমাটি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট সাতটি পুরস্কার জয় করে।
দুই বাংলার প্রেক্ষাগৃহে ২০২৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একযোগে মুক্তি পাওয়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটি এবার ওটিটি মুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষার দর্শকদের মন জয় করতে যাচ্ছে।