ধরলা নদীর উত্তাল বুকে সুর তুলে জল কেটে দ্রুতগতিতে ছুটছে একেকটি বাইচের নৌকা। আর নদীর দুই তীরে ঢল নেমেছে হাজার হাজার উৎসুক মানুষের। করতালি, উল্লাস আর মাঝি-বাইচালদের সমবেত হাঁকডাকে ঝিমিয়ে পড়া বিকেলগুলো রূপ নিচ্ছে আনন্দঘন উৎসবে। গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা আবহমান ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ধরলা নদীতে বসেছে এই বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা।
ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে গত ২৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আয়োজনে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ১২টি বিশালাকার বাইচের নৌকা ও শতাধিক দক্ষ বাইচাল অংশ নেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অনুষ্ঠিত জমজমাট সেমিফাইনালে জয়লাভ করে ফাইনালে নাম লিখিয়েছে উলিপুর থেকে আসা ‘তামিম বাংলা’ এবং স্থানীয় হক বাজার এলাকার ‘দাদাভাই’ নামের দুটি নৌকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন বিকেল হলেই ধরলা সেতু থেকে আশপাশের প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়ক ও নদীর দুই পাড়ে সমাগম ঘটে নারী, পুরুষ, শিশুসহ নানা বয়সের মানুষের। অনেকেই ট্রলার ও ছোট নৌকায় উঠে আবার কেউ উঁচুপাড়ে দাঁড়িয়ে বাইচ উপভোগ করছেন। কেবল খেলাধুলার আনন্দই নয়, নদীর পাড়জুড়ে বসেছে গ্রামীণ মেলাও, যা পুরো এলাকাকে এক মিলনমেলায় পরিণত করেছে।
১০ কিলোমিটার দূর থেকে পরিবার নিয়ে খেলা দেখতে আসা দর্শনার্থী অসীম কুমার রায় ও ববিতা খাতুন জানান, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন আর আগের মতো নৌকাবাইচ দেখতে পাওয়া যায় না। তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে এমন আনন্দ উপভোগ করতে তারা ছুটিয়ে এসেছেন ধরলার পাড়ে।
আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, "লোকজ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী ধারা আমাদের মনকে নির্মল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় ঐতিহ্য তুলে ধরতে এমন আয়োজন সত্যি প্রশংসনীয়।"
নৌকাবাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও শিমুলবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা সামছুজ্জামান হাসু জানান, গ্রামবাংলার এই প্রাচীন খেলা যুবসমাজকে মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত মহাফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে আয়োজকরা প্রতি বছর নিয়মিত এই বাইচ আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।