নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডে ৭ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের প্রাণহানি; কাঠগড়ায় ফায়ার লাইসেন্সহীন বেআইনি হোটেল ও প্রশাসন
রাত তখন আড়াইটা। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, হঠাৎ পুরো ভবনে শুরু হয় তীব্র ধোঁয়া ও অক্সিজেনের সংকট। যারা টের পেয়ে বের হতে পেরেছেন তাঁরা জীবন বেঁচেছেন, আর বাকিরা ঘুমের ঘোরেই চিরতরে ঢলে পড়েছেন মৃত্যুর কোলে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামের এক আবাসিক হোটেলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। যাদের মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশী নাগরিক এবং বাকি ২ জন ভারতীয়। এই অগ্নিকাণ্ডের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহরটির হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে।
‘মিনি বাংলাদেশ’ খ্যাত এলাকার হোটেলগুলোর জরাজীর্ণ চিত্র
কলকাতা নিউ মার্কেটের কলিন স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকাটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত। এ এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১২০০টি আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে।
নিউমার্কেটের মতো অতি ঘিঞ্জি এলাকার সিংহভাগ ভবনই বহু বছরের পুরোনো। পর্যটক ও রোগী টানতে এসব পুরোনো ভবনের ভেতরে প্লাইউড ও সানমাইকার আধুনিক ডেকারেশন করা হলেও নিরাপত্তা নজরদারি একেবারেই অনুপস্থিত।
গোলকধাঁধা পরিবেশ: বেশিরভাগ গেস্ট হাউজের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ চেনা কঠিন। সরু গলিপথে পাশাপাশি দুজন মানুষের যাতায়াতও দুষ্কর।
জরুরি ব্যবস্থার অভাব: অধিকাংশ ভবনে নেই কোনো ব্যালকনি বা বিপদকালে উদ্ধারের জন্য অতিরিক্ত ফায়ার এক্সিট (জরুরি সিঁড়ি)।
ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ: কয়েক দশকের পুরোনো লিফ্ট এবং যত্রতত্র ঝুলন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ইলেকট্রিক তারের নেটওয়ার্ক।
তদন্তে উন্মোচিত অনিয়ম ও অলৌকিক আত্মরক্ষা
কলকাতা পুলিশ ও দমকল বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে বের হয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ‘শিখা ইন’ হোটেলটিতে কোনো ফায়ার লাইসেন্স ছিল না এবং দীর্ঘ দিন কোনো ফায়ার অডিট করা হয়নি। এমনকি দেয়াল তুলে এমার্জেন্সি গেটের বের হওয়ার পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
গাজীপুরের বাসিন্দা মো. আসাদুজ্জামান চিকিৎসাসেবা নিতে এসে ঐ হোটিতেই উঠেছিলেন। ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান:
“আমি পাঁচ তলায় ছিলাম। আগুন লাগার পরই কোনোক্রমে পরনের গেঞ্জি দিয়ে নাক-মুখ চেপে ধরে ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই। আর এক মিনিট দেরি হলেই হয়তো আমিও বেঁচে ফিরতে পারতাম না।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও কঠোর ব্যবস্থার হুশিয়ারি
ঘটনার পর কলকাতা ও রাজ্য রাজনীতির শীর্ষ নেতারা হোটেলগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলেছেন।
| রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দল | বক্তব্য ও দাবিকৃত পদক্ষেপ |
| নবীন মিশ্র (বিজেপি কনভেনার) | অবৈধ হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন, হোটেল সিলগালা করা ও বেআইনি স্থাপনায় বুলডোজার চালানোর আহ্বান। |
| মোহাম্মদ সেলিম (সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক) | বাংলাদেশ থেকে আসা অতিথিদের নিরাপত্তায় ব্যর্থতাকে মানবতার লজ্জা আখ্যা দিয়ে পুরসভা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দুর্নীতির ওপর দায় চাপান। |
আবাসিক হোটেলগুলোতে বারবার অগ্নিকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় পৌরসভা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার একাংশের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ও ছাড়পত্র প্রদানকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা।