৩৬-এ জেনিফার লরেন্স: সামাজিক অস্বস্তি জয় করা কৈশোর থেকে হলিউড শাসন!
হলিউডের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী তারকা জেনিফার লরেন্স আজ পা দিলেন ৩৬ বছরে। অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা বিজয়ী এ অভিনেত্রী মাত্র ২২ বছর বয়সে অস্কার জিতে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন। ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’–এর সাহসি চরিত্র ‘ক্যাটনিস এভারডিন’ থেকে শুরু করে ‘উইন্টার্স বোন’ কিংবা ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’–এর মতো মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা—সব ধারার সিনেমাতেই সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তিনি। বর্তমানে প্রায় ১৬ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা) মূল্যের সম্পদের মালিক এই হলিউড তারকা।
১৯৯০ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকির লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন জেনিফার শ্রেডার লরেন্স। বাবা গ্যারি লরেন্স ছিলেন নির্মাণ ব্যবসায়ী এবং মা কারেন পরিচালনা করতেন শিশুদের ক্যাম্প। ছোটবেলায় অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও সামাজিক অস্বস্তির কারণে নিজেকে অনেকটা ‘বেমানান’ মনে করতেন জেনিফার। শৈশবের সেই অস্বস্তি কাটাতে এবং নিজের মানসিক স্বস্তি পেতেই অভিনয়কে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন তিনি।


১৪ বয়সে নিউইয়র্ক যাত্রা ও অভিনয়ে উত্থান
মাত্র ১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে বেড়াতে গিয়ে এক প্রতিভা অন্বেষকের নজরে পড়েন জেনিফার। পরদিনই পান অডিশনের প্রস্তাব। অডিশনে তাঁর সহজাত অভিনয় দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন এজেন্টরা। অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নিতে হাইস্কুলের পড়া মাত্র দুই বছরেই শেষ করেন তিনি।
২০০৭ সালে ‘দ্য বিল এনভাল শো’ দিয়ে টেলিভিশন ক্যারিয়ার শুরু এবং ২০০৮ সালে ‘দ্য বার্নিং প্লেন’ সিনেমা দিয়ে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। এই ছবির জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে উদীয়মান শিল্পী হিসেবে মারচেলো মাস্ত্রোয়ান্নি পুরস্কার পান তিনি।
উইন্টার্স বোন (২০১০): ডেবরা গ্র্যানিক পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে দরিদ্র কিশোরী রি ডলি চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়ান জেনিফার। মাত্র ২০ বছর বয়সে পান জীবনের প্রথম সেরা অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার মনোনয়ন।
দ্য হাঙ্গার গেমস (২০১২): ‘ক্যাটনিস এভারডিন’ চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি বিশ্বতারকায় পরিণত হন। প্রথম কিস্তিতে মাত্র ৫ লাখ ডলার পারিশ্রমিক পেলেও ফ্র্যাঞ্চাইজির অভূতপূর্ব সাফল্যে তাঁর আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। চার কিস্তিতে এই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সর্বকালের সফল নারী অ্যাকশন তারকার খ্যাতি পান।
অস্কার জয় ও রেকর্ড পারিশ্রমিক
২০১২ সালে ডেভিড ও রাসেলের ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’ সিনেমায় ব্র্যাডলি কুপারের বিপরীতে ‘টিফানি ম্যাক্সওয়েল’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে ইতিহাস গড়েন জেনিফার। ২০১৩ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জয় করেন তিনি। অস্কারের ইতিহাসে তিনি এ বিভাগে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী এবং ১৯৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া প্রথম অভিনয়শিল্পী হিসেবে এই স্বীকৃতি লাভ করেন।
লিঙ্গভিত্তিক পারিশ্রমিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
‘আমেরিকান হাসল’ সিনেমার পারিশ্রমিক নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হলিউডের পারিশ্রমিক বৈষম্য নিয়ে কথা বলেন জেনিফার লরেন্স। সনি পিকচার্সের তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে উঠে আসে যে, একই ছবিতে পুরুষ সহশিল্পী ব্র্যাডলি কুপার, ক্রিশ্চিয়ান বেল ও জেরেমি রেনার ৯ শতাংশ লাভ পেলেও জেনিফার ও অ্যামি অ্যাডামস পেয়েছিলেন মাত্র ৭ শতাংশ। হলিউডের মতো ইন্ডাস্ট্রিতে শীর্ষ নারী তারকা হওয়া সত্ত্বেও এই বৈষম্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন তিনি।
২০১৪ সালে হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর খ্যাতির অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হয় তাঁর জীবনে। এই ঘটনাকে তিনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর মারাত্মক আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করে এরপর থেকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখা শুরু করেন।
ব্যক্তিগত জীবন, মাতৃত্ব ও প্রযোজনায় প্রত্যাবর্তন
২০১৯ সালের অক্টোবরে শিল্পকর্ম বিক্রেতা কুক মারোনিকে বিয়ে করেন জেনিফার লরেন্স। এই দম্পতির ২০২২ সালে প্রথম সন্তান ‘সাই’ এবং ২০২৫ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন্মগ্রহণ করে। বর্তমানে দুই সন্তানকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে তাঁর জীবন।
২০১৮ সালে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আ এক্সিলেন্ট ক্যাডেভার’ গড়ে তোলার পর তিনি ‘কজওয়ে’, ‘ব্রেড অ্যান্ড রোজেস’ এবং ২০২৩ সালের সফল কমেডি ছবি ‘নো হার্ড ফিলিংস’ প্রযোজনা ও অভিনয় করেন। সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করে।
২০২১ সালে ‘ডোন্ট লুক আপ’ সিনেমার মাধ্যমে আড়াই কোটি ডলার পারিশ্রমিক নিয়ে তিনি বড় পর্দায় ফেরেন। আগামী ২০ নভেম্বর ২০২৬ এ মুক্তি পেতে যাওয়া ‘দ্য হাঙ্গার গেমস: সানরাইজ অন দ্য রিপিং’ সিনেমায় পুনরায় ‘ক্যাটনিস এভারডিন’ চরিত্রে জেনিফারের ফেরার অপেক্ষায় মুখিয়ে আছেন তাঁর বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি ভক্ত।