চার দেশের শতাব্দী প্রাচীন বৈরিতা: ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের আখ্যান


ক্রীড়া প্রতিবেদক | ট্রেন্ডনিউজবিডি , আপডেট করা হয়েছে : 13-07-2026

চার দেশের শতাব্দী প্রাচীন বৈরিতা: ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের আখ্যান

আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন এবং ইংল্যান্ড—ফুটবল বিশ্বের পরাশক্তি এই চার দেশ ইতিহাসে এই প্রথম ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চারটি স্থান দখল করে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বা শেষ চারে মুখোমুখি হয়েছে। তবে এই চার দেশের লড়াই কেবল ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস আর ৯০ মিনিটের তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, কখনো সাম্রাজ্য বিস্তার, কখনো আবার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এই দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। প্রতিটি ঐতিহাসিক সংঘাতই পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রকে বিভিন্ন সময়ে বদলে দিয়েছে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই চার পরাশক্তির মাঠের লড়াইয়ের উত্তেজনার মাঝেই ফুটবল মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার বহু আগে রণাঙ্গনে কীভাবে এই দেশগুলো মুখোমুখি হয়েছিল, তা ফিরে দেখা প্রয়োজন।

ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার ‘হান্ড্রেড ইয়ার্স ওয়ার’ বা শতবর্ষী যুদ্ধ। ১৩৩৭ থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১১৬ বছর ধরে দফায় দফায় এই যুদ্ধ চলে দুই দেশের মধ্যে। মূলত ফরাসি সিংহাসনের উত্তরাধিকার এবং ফ্রান্সের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ছিনিয়ে নেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইংল্যান্ড একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ জয় পেলেও পরবর্তীতে মাত্র ১৭ বছর বয়সি এক সাধারণ কৃষককন্যা জোয়ান অব আর্ক ফরাসি সেনাদের নেতৃত্ব দিয়ে রণাঙ্গনে নামলে যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। তাঁর বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে অবশেষে ১৪৫৩ সালের যুদ্ধে ফরাসিদের বিজয়ের মাধ্যমে এই দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটে।

শতবর্ষী যুদ্ধের পর ষোড়শ শতকের শেষভাগে ইংল্যান্ড ও স্পেনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। এর প্রধান কারণ ছিল ধর্মীয় মতবিরোধ এবং উপনিবেশ বিস্তারের তীব্র প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের আধিপত্য বিস্তার এবং নেদারল্যান্ডসে স্পেনবিরোধী বিদ্রোহীদের ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকে সমর্থন দেওয়া এই সম্পর্ককে আরও খারাপ করে তোলে। এই সংঘাতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল ‘স্প্যানিশ আর্মাডা’। ১৫৮৮ সালে স্পেন এক বিশাল নৌবহর পাঠিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমণের চেষ্টা করলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাদের সেই ঐতিহাসিক অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ সংঘাতের পর স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের মৃত্যুর পর উভয় দেশ ১৬০৪ সালে ঐতিহাসিক লন্ডন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ইতি টানে।

সপ্তদশ শতকে ইউরোপ মহাদেশে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আবারও মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স ও স্পেন। ১৬৩৫ থেকে ১৬৫৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধটি ছিল ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এই যুদ্ধটি মূলত শুরু হয়েছিল বিখ্যাত ‘থার্টি ইয়ার্স ওয়ার’ বা ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধের একটি অংশ হিসেবে, যা পরবর্তীতে একটি স্বাধীন ও পৃথক যুদ্ধে রূপ নেয়। দীর্ঘ সংঘর্ষের পর ১৬৫৯ সালে ‘ট্রিটি অব দ্য পিরেনিস’ বা পিরেনিস চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই যুদ্ধের পর থেকেই ইউরোপের বুকে স্পেনের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় অঞ্চলের বাইরে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার সংঘাতটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত যুদ্ধ, যা ১৯৮২ সালের ১৪ জুন অবসান ঘটলেও এর ক্ষত চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও শুকোয়নি। দক্ষিণ আটলান্টিকের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক দ্বীপপুঞ্জ ‘ফকল্যান্ড’কে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। মাত্র ৭৪ দিনের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র যুদ্ধটি দুই দেশের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জটি ১৮৩৩ সাল থেকেই ইংল্যান্ডের দখলে থাকলেও আর্জেন্টিনা বরাবরই একে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে এসেছে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার দ্বীপটি দখল করে নিলে ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। জল, স্থল এবং আকাশপথে টানা লড়াইয়ের পর অবশেষে ১৯৮২ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে।

আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যে সরাসরি কোনো বড় যুদ্ধ না হলেও পরিস্থিতি প্রায় যুদ্ধাবস্থার মতোই তৈরি হয়েছিল। ১৮৪৫ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে উরুগুয়ের গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বুয়েনস আইরেস বন্দরের নৌবাণিজ্য সম্পূর্ণরূপে আটকে দিয়েছিল ফরাসি ও ব্রিটিশ নৌবাহিনী। অন্যদিকে, ১৮১০ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের ঐতিহাসিক লড়াই, যা আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। স্প্যানিশদের দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার বিপ্লবী বাহিনীর সঙ্গে স্পেনের রাজকীয় বাহিনীর এই রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়েছিল। দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্প্যানিশদের শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আর্জেন্টিনা।


অফিস: নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০

ইমেইল : info@trendnewsbd.com