কুরআনের আয়াতে বাংলাদেশকে বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা দিল ইরান


আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | সোহেল জুলফিকার , আপডেট করা হয়েছে : 05-07-2026

কুরআনের আয়াতে বাংলাদেশকে বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা দিল ইরান

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান বিশ্ব কূটনীতির এক অভিনব মঞ্চায়নে রূপ নিয়েছে। অনুষ্ঠানে আগত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ইরান কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে পবিত্র কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন আয়াত তিলাওয়াত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পৃথক দুটি প্রতিনিধিদল যখন প্রয়াত নেতার কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে যায়, তখন তাদের সামনে সুরা আল-আহযাব এবং সুরা আলে ইমরানের বিশেষ কিছু আয়াত শোনানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়াতগুলোর তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঢাকাকে এক বিশেষ কূটনৈতিক ও আদর্শিক বার্তা দিয়েছে তেহরান।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সামনে সুরা আল-আহযাবের তিলাওয়াত

জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হলে তাঁর সামনে সুরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। ওই আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের কেউ কেউ (শাহাদাতবরণ করে) নিজেদের শপথ পূর্ণ করেছে, আর কেউ কেউ (শাহাদাতের) প্রতীক্ষায় আছে। এবং তারা তাদের অঙ্গীকারে সামান্যতমও পরিবর্তন করেনি।’ ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, ওহুদের যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার আগে সাহাবিরা অঙ্গীকার করেছিলেন যে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাবেন না এবং শহীদ হওয়া পর্যন্ত লড়াই করবেন। সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-সহ কয়েকজন সাহাবি এই অঙ্গীকার পূর্ণ করে শহীদ হয়েছিলেন। ইরান মূলত বাংলাদেশের স্পিকারের সামনে এই আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঢাকার দীর্ঘদিনের অবিচল কূটনৈতিক অবস্থান এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেছে।

ইসলামী দলগুলোর প্রতিনিধিদল ও সুরা আলে ইমরানের বার্তা

এদিকে, ইরান সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপির নেতৃত্বে দেশটিতে সফরে যাওয়া আরেকটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন আয়াত পাঠ করা হয়। এই প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন মো. নুরুল আমীন এমপি, ড. মো. কেরামত আলী এমপি, ডা. এস এম খালিদুজ্জামান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এমপি সাইদউদ্দিন আহমাদ হাঞ্জালা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁরা যখন শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলেন, তখন সুরা আলে ইমরানের ১৬৯ ও ১৭০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। সুরা আলে ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, রিযিকপ্রাপ্ত।’ আর ১৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছেন, তাতে তারা খুশি। আর তারা উৎফুল্ল হয়, পরবর্তীদের থেকে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের বিষয়ে। এজন্য যে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’

কূটনৈতিক ও আদর্শিক মূল্যায়নের নতুন সমীকরণ

দেশের ইসলামী ধারার দল ও সংগঠনগুলোকে নিয়ে গঠিত এই বিশেষ প্রতিনিধিদলের সামনে শাহাদাত ও পরকালের চিরন্তন পুরস্কারের আয়াত শুনিয়ে ইরান এক গভীর আদর্শিক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তেহরান মূলত এর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছে, খামেনির আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়ার কিছু নেই; বরং আল্লাহর পথে আত্মত্যাগকারীরা সবসময়ই আত্মিকভাবে জীবিত ও সফল। একই সঙ্গে এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রামকে একধরনের তাত্ত্বিক স্বীকৃতি ও সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন। কফিনের পাশে শোনানো এই আয়াতগুলো কেবল সাধারণ ধর্মীয় তিলাওয়াত ছিল না; বরং এর মাধ্যমে ইরান কূটনৈতিকভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শোকের এই বৈশ্বিক মুহূর্তেও কোন দেশ ও দল তেহরানের সঙ্গে কেমন বন্ধনে আবদ্ধ, তা তারা খুব ভালো করেই মূল্যায়ন করছে।


অফিস: নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০

ইমেইল : info@trendnewsbd.com