মালয়েশিয়াকে দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দিতে ও আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি | সোহেল জুলফিকার , আপডেট করা হয়েছে : 22-06-2026

মালয়েশিয়াকে দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দিতে ও আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যত দ্রুত সম্ভব খুলে দেওয়ার এবং আরও বেশিসংখ্যক কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় 'পারদানা পুত্রা'য় মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করছেন, যাদের অবদান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর। এই প্রেক্ষাপটে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে এবং দ্রুততম সময়ে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ করেন। এ সময় তিনি অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিতকরণ এবং মালয়েশিয়ায় আটকে থাকা বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করেন। উভয় নেতাই একমত হয়েছেন যে, কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে এবং কর্মীদের অভিবাসন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর পাশাপাশি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বিনিময় করা হয়। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে। দুই দেশই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক জোরদারে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথ কমিশন বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক পরামর্শসহ বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। এই ফলপ্রসূ আলোচনায় আইসিটি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন উচ্চ-মূল্যের খাত স্থান পেয়েছে। একই সাথে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে তাঁরা 'বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি'র আলোচনা এগিয়ে নিতে একমত প্রকাশ করেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।

দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি শক্তিশালী ম্যান্ডেট লাভ করেছে। জনগণের বিপুল সমর্থনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের এখনকার মূল অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের প্রশংসা করেন এবং ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগাযোগ চায় এবং 'আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। বাংলাদেশ আরসিইপিতে যোগ দিতে আগ্রহী উল্লেখ করে এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থনের প্রশংসা করেন তিনি। উভয় নেতা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু নিয়েও মতবিনিময় করেন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় অতীতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্মরণ করে ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এবং ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করেন, যা দুই দেশের বন্ধুত্ব ও শ্রম সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন ও বিস্তৃত করেছিল। তারেক রহমান জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রথম যেসব ফোনকল পেয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অভিনন্দন ও সফরের আমন্ত্রণ বার্তা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে নিয়ে এখানে আসতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিত বোধ করছেন বলে জানান। তিনি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তাঁর স্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান।

উক্ত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ प्रतिनिधि দলে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এর আগে সকাল ৯টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান 'পারদানা পুত্রা'য় পৌঁছালে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও মালয়েশীয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল কর্তৃক 'গার্ড অব অনার' প্রদান করা হয়। সংবাদ সম্মেলনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ডা. জোবায়দা রহমান এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকারি বাসভবন 'সেরি পারদানা কমপ্লেক্স'-এ এক রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন, যেখানে মালয়েশীয় শিল্পীরা বাংলা ও মালয় উভয় ভাষায় গানসহ দারুণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত রবিবার রাতে কুয়ালালামপুর পৌঁছানো প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


অফিস: নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা-১০০০

ইমেইল : info@trendnewsbd.com