টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ভেঙ্গুলার গ্রামের নারী খামারি হামিদা আক্তার দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সন্তানের মতো করে লালন-পালন করেছেন সাদা-কালো রঙের একটি বিশাল ষাঁড়। প্রায় ৫৬ মণ ওজনের এই প্রকাণ্ড ষাঁড়টির নাম তিনি ভালোবেসে রেখেছিলেন ‘মানিক’। গত কয়েক বছর ধরে গরুটি বিক্রির চেষ্টা করেও তিনি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছিলেন না। অবশেষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যে গরুটি কিনে নিয়েছে। বর্তমানে ‘মানিক’ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন নগরে ফাউন্ডেশনের নিজস্ব খামারে অবস্থান করছে। পবিত্র ঈদুল আজহার তৃতীয় দিনে গরুটি কোরবানি দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে এর মাংস রান্না করে স্থানীয় এতিম, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হবে বলে ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আজ বুধবার সরজমিনে দেখা যায়, আলাউদ্দিন নগরের খামারে একটি আধুনিক টিনশেডের পাকা ঘরে ‘মানিক’–কে রাখা হয়েছে এবং তার আরামের জন্য মাথার ওপর সার্বক্ষণিক ফ্যান ঘুরছে। খামারের কর্মচারী রেহেনা বেগম জানান, গত সোমবার টাঙ্গাইল থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গরুটি এই খামারে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে তাকে উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও উন্নতমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। মুঠোফোনে আলাপকালে খামারি হামিদা আক্তার জানান, কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলেও তিনি অন্তত এই ভেবে খুশি যে কোনো ব্যাপারী বা কসাইয়ের কাছে মানিককে বিক্রি করতে হয়নি, বরং একজন ভালো মানুষের কাছে বিক্রি করতে পেরেছেন। এই বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি তাঁর পুঞ্জীভূত ঋণের একটি বড় অংশ পরিশোধ করতে পেরেছেন। তিনি আরও জানান, গত বছর একজন ক্রেতা গরুটির দাম ১৫ লাখ টাকা বলেছিলেন এবং এবারও একজন ১৮ লাখ টাকা দাম হাঁকিয়ে আর ফিরে আসেননি। তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল গরুটি অন্তত ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন, কিন্তু শেষ সময়ে বড় গরুর ক্রেতা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামেই ছেড়ে দিতে হয়েছে।
হামিদা আক্তার তাঁর বিগত দিনগুলোর কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে লালন-পালন করলেও মানিককে খাওয়ানোর পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার অর্ধেক টাকার চালানও এই বিক্রি থেকে ওঠেনি। মানিক প্রতিদিন ১০ হালি করে বিচি কলা, ৪ কেজি বুট, পরিমাণমতো ভুসি এবং এক কেজি আতপ চালের ভাত খেত। এই বিশাল খরচ মেটাতে গিয়ে তিনি অনেক টাকা ধারদেনা করেছিলেন, যার একাংশ মানিকের বিক্রির টাকা দিয়ে শোধ করলেও এখনো তাঁর ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ রয়ে গেছে। হামিদা যখন স্নাতকে পড়তেন, তখন তাঁর মা মারা যান; বর্তমানে পরিবারে তাঁর ছোট বোন এবং বৃদ্ধ বাবা রয়েছেন। নিজে মাস্টার্সে পড়ার পাশাপাশি তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন এবং একই সাথে বাড়ির খামারটি দেখাশোনা করছেন। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে একটি আদর্শ খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে এই সংগ্রামী তরুণীর। আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম জানান, অনলাইনে নারী উদ্যোক্তা হামিদার এই অসহায়ত্ব ও লড়াইয়ের বিষয়টি জানতে পেরে ফাউন্ডেশন মানবিক কারণে গরুটি কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।